প্রায় ফুরিয়ে যাওয়া খাবারের অবশিষ্ট নিয়ে কাড়াকাড়িতে সাগরের মাঝেই নৌযানে ভীষণ মারামারি বাধে। বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে এ মারামারিতে একটি নৌকাতেই নিহত হন ১০৪ ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত মানুষ।
গত শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূল থেকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারা হৃদয়বিদারক এই কাহিনি শোনান। মারামারির সময় সাগরে নৌকাটি ডুবতে বসলে ইন্দোনেশিয়ার জেলেরা তা দেখে আরোহীদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। পরে তাঁদের সহযোগিতায় নৌবাহিনী নৌকার ৭০০ আরোহীকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসে। এরা অনেকেই এখন অপুষ্টি ও পানিশূন্যতায় আক্রান্ত। খবর বিবিসি, এএফপি ও গার্ডিয়ানের।
বেঁচে যাওয়া এসব ব্যক্তির বর্ণনায় উঠে আসে করুণ ও রোমহর্ষক ঘটনার দৃশ্য। তাঁরা বলেন, মারামারি চলাকালে আরোহীদের কাউকে কাউকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। কাউকে বা মারা হয় গলায় রশিতে ফাঁস দিয়ে। আবার কাউকে মারা হয় সাগরে ছুড়ে ফেলে।
ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের লাঙ্গসা বন্দরের একটি আশ্রয়শিবিরে বিবিসির সংবাদদাতা মার্টিন প্যাশেন্স প্রাণে বাঁচা নৌযাত্রীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের অন্তত তিনজন পৃথকভাবে তাঁকে এই কাহিনি শোনান। ইতিমধ্যে মারামারিকালে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে, পরে উদ্ধার হওয়া ১৪ বছরের বাংলাদেশি কিশোর আফসারুদ্দিনও বার্তা সংস্থা এএফপিকে একই কথা জানায়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন বাংলাদেশি মোহাম্মদ রফিক বলছিলেন, ‘নৌকার ওপর আমাদের মারধর করা হয়েছে। সহ্য করতে না পেরে আমরা পানিতে ঝাঁপ দিই। এর মধ্যে যারা সাঁতার জানত তারা ভেসে ছিল। যারা জানত না তারা পানিতে ডুবে মারা গেছে। ১০৪ জনের মতো মারা গেছে।’
রফিক আরও বলেন, ‘ছোট ছেলেমেয়েদের আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। এই ঘটনাটা চলে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাত নয়টা পর্যন্ত। এরপর ছয় ঘণ্টা আমরা পানিতে ভেসে ছিলাম। তারপর ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী এবং জেলে যারা অনেক দূরে মাছ ধরতে যায়, তারা আমাদের তুলে নেয়।’
বিবিসি বলেছে, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অনেকে বলেছেন, কয়েকজনকে ছুরি মারা হয়েছে ও কয়েকজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা কঠিন। কিন্তু অন্যান্য সংবাদমাধ্যম একই ঘটনার কথা যেভাবে বলেছে, সেগুলোর বর্ণনার সঙ্গে এর মিল রয়েছে।
উদ্ধার হওয়া অপর বাংলাদেশি আফসারুদ্দিন বলে, তারা মালয়েশিয়া যেতে চাইছিল। দুই মাস ধরে নৌযানটি আন্দামান সাগরে ভাসছিল। উদ্ধার হওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে নৌযানের চালকেরা আরোহীদের মাঝসাগরে রেখে পালিয়ে যায়। পরে নৌযানটি দিগ্ভ্রান্তের মতো ভেসে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝামাঝি স্থানে গেলে উভয় দেশের নৌবাহিনী তাদের উপকূলে ভিড়তে বাধা দেয়। এরই মধ্যে খাবার ও পানির মজুতও প্রায় ফুরিয়ে আসে। এ নিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভয়াবহ মারামারি। এ সময় অনেককে পানিতে ছুড়ে ফেলা হয়। কাউকে বাধ্য করা হয় ঝাঁপ দিতে।
আফসার বলে, ‘তার সামনে মেরে ফেলা হয়েছে ছোট চাচা মাইনুদ্দিন (১৬) ও আরেক স্বজন নবী হোসেনকে (১৮)। মাইনুদ্দিন আরও কিছু খাবার চেয়েছিল। এটাই ছিল তার অপরাধ। চালকেরা তাকে পেটানো শুরু করে। নবী এগিয়ে যান। তখন তাদের দুজনকেই ওরা সাগরে ফেলে দেয়। একসময় প্রাণে বাঁচতে আমিও ঝাঁপ দিই।’
এ রকমই দৃশ্যের সাক্ষী রোহিঙ্গা মুসলিম মোহাম্মদ আমিন (৩৫) বলছিলেন, ‘একটি পরিবারের তিন সদস্যকে কাঠের তক্তা দিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরে ফেলা হয়। পরে লাশগুলো সাগরে ছুড়ে ফেলা হয়। এঁরা ছিলেন একজন বাবা, একজন মা ও তাঁদের সন্তান।’
ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের লাঙ্গসার একটি হাসপাতালে সারি সারি স্ট্রেচারের ওপর শুয়ে থাকা অভিবাসীদের একজন বলছিলেন, ‘তারা হাতুড়ি দিয়ে আমাকে মেরেছে, ছোরা দিয়ে কুপিয়েছে।’ তিনি জানান, সাগরে পাড়ি জমানোর আগে গোটা জীবন তাঁর কেটেছে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে। তিনি দাবি করেন, প্রায় দুই মাসের দুর্গম সাগরযাত্রায় তাঁদের নৌকার অন্তত ২০০ জন না খেয়ে, অসুখে, দাঙ্গা-হাঙ্গামায় মারা গেছেন।
নৌকায় দাঙ্গা-হাঙ্গামার ব্যাপারে লাঙ্গসা ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান সৈয়দ ওসমান বলেন, সাগরে ভয়াবহ মারামারির পর আশ্রয়শিবিরেও পৃথক স্থানে রয়েছেন উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারা। তিনি বলেন, ‘যতদূর শুনেছি, এই বাংলাদেশিরা কাজের আশায় মালয়েশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। আর মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা বলেছেন, তাঁরা সরকারের নির্যাতন থেকে প্রাণে বাঁচতে পালাচ্ছিলেন।’
প্রসঙ্গত, ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উপকূলে শুক্রবার দুটি নৌযান থেকে ৭৪৭ জন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলমানকে উদ্ধারের পর এ উপকূলে একই দিন আরেকটি নৌকা থেকে ২০০ জনকে উদ্ধার করা হয়। এ দিনই থাইল্যান্ডের একটি দ্বীপেও সন্ধান পাওয়া যায় আরও শতাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশীর।
এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া উপকূল থেকে অন্তত ৩ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী উদ্ধার হলেন। এ অঞ্চলের আন্দামান সাগরে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও অসুস্থতায় মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে সাত-আট হাজার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা।

print