বিশেষ প্রতিবেদন : বিএনপির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা সংগঠনের মাসিক চাঁদা দেয়ার ব্যাপারে একেবারেই আন্তরিক নন। দলটির স্থায়ী ও জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ৩৮৬ জনের মধ্যে মাত্র ৩৫ জন নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ করেন। বাকি ৩৫১ জনের মধ্যে অর্ধশত নেতা গত সাড়ে ৫ বছর ধরে কোনো চাঁদাই দেননি। অন্যরা অনিয়মিতভাবে এটি পরিশোধ করেন। এ পর্যন্ত বকেয়া চাঁদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ লাখ টাকারও বেশি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শুক্রবার বিকালে টেলিফোনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নিয়মিত চাঁদা না দিলে দলকে সংঘাতিক সমস্যায় পড়তে হয়। নিয়মিত চাঁদা না দিলে দল বাঁচবে কি করে? যারা চাঁদা নিয়মিত পরিশোধ না করেন তারা দলকে ভালোবাসেন কিনা সে নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। যারা চাঁদা না দেন, তারা তো ফাঁকিবাজ।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে ৫ বছর ধরে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বেশির ভাগই মাসিক চাঁদা পরিশোধ করেননি। এমনকি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এমন নেতারাও দলের মাসিক চাঁদা দেয়ার ব্যাপারে উদাসীন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন- দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, আবদুল মঈন খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হান্নান শাহ, নজরুল ইসলাম খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

শুক্রবার বিএনপির সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা যুগান্তরকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যারা চাঁদা পরিশোধ করেন না, তারা দলের বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। চাঁদার বিষয়টি হয় তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু এর মাধ্যমে বোঝা যায় সংশ্লিষ্ট নেতারা দলের প্রতি কতটা অনুগত।

দলীয় সূত্র জানায়, দলের স্থায়ী কমিটির প্রতি সদস্যের মাসিক চাঁদার পরিমাণ এক হাজার টাকা, প্রতি ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টার পদমর্যাদার নেতার পাঁচশ টাকা এবং প্রতি সম্পাদকের ক্ষেত্রে তিনশ টাকা, সহ-সম্পাদকের ক্ষেত্রে দুইশ টাকা এবং সদস্যদের ক্ষেত্রে একশ টাকা মাসিক চাঁদা দলীয়ভাবে নির্ধারণ করা আছে।

আরও জানা গেছে, দলের গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশত নেতা ২০০৯ সালের পরে কোনো মাসিক চাঁদা দেননি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন নেতার বকেয়া চাঁদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ লাখ টাকারও বেশি। এর সঙ্গে যদি চলতি বছরের বকেয়া হিসাব করা হয়, তাহলে বকেয়া টাকার পরিমাণ আরও বাড়বে। দলের ৩৮৬ সদস্যের নির্বাহী কমিটির মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ১৯, ভাইস চেয়ারম্যান ১৮, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদ রয়েছে ৩৬টি। বাকি পদগুলো হচ্ছে সম্পাদক, সহ-সম্পাদক ও সদস্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দলের পক্ষ থেকে যেসব নেতাদের কাছে বকেয়া চাঁদা পাওয়া যাবে তাদের বারবার তাগাদা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো কাজই হচ্ছে না। হাতেগোনা কয়েজন নেতা ছাড়া কেউই নিয়মিত চাঁদা দেন না।

শুক্রবার টেলিফোনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের সহ-দফতর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন যুগান্তরকে বলেন, যেসব নেতাদের কাছে বকেয়া বেশি রয়েছে, তারা সময় নিয়ে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করছেন। মাসিক চাঁদা পরিশোধের এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম ও ড. আবদুল মঈন খানের কাছে সবচেয়ে বেশি বকেয়া পড়েছে। তাদের প্রতিজনের কাছে ৬০ হাজার টাকা করে বকেয়া পড়েছে। এছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের কাছে ৫৩ হাজার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আ স ম হান্নান শাহের কাছে ৫১ হাজার, নজরুল ইসলাম খানের কাছে ৪৬ হাজার টাকা বকেয়া পড়েছে। এছাড়া, দলের ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, এম মোর্শেদ খান ও সাদেক হোসেন খোকা তাদের প্রতিজনের কাছে ৩২ হাজার টাকা করে বকেয়া রয়েছে। ৩০ হাজার টাকা করে বকেয়া পড়েছে ভাইস চেয়ারম্যান টিএইচ খান, হারুন অর রশিদ, আবদুুুল্লাহ আল নোমানের। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের মধ্যে ফজলুর রহমান পটল, রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম, খন্দকার শহিদুল ইসলাম তাদের প্রত্যেকের কাছে বকেয়া পড়েছে ৩০ হাজার টাকা করে। এছাড়া ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাউদ্দিনের ২৫ হাজার টাকা, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ১৫ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে। সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবুর রহমান সরোয়ারের চাঁদা বকেয়া পড়েছে ২৯ হাজার টাকা। জাকারিয়া তাহের সুমনের কাছে ১৫ হাজার টাকা, আবদুুস সালামের কাছে ১৭ হাজার টাকা, সৈয়দ অহিদুল আলমের কাছে ২০ হাজার টাকা, কবির মুরাদের কাছে ১৭ হাজার টাকা বকেয়া চাঁদা রয়েছে।

এছাড়া যেসব নেতা নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ করেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন- বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ৩৫ জন।

print