শিরিনা আফরোজ: পিরোজপুর জেলা সদরের কলাখালী গ্রামের ইদ্রিস আলী সরদার ভিষণ ভাবে ফুটবল প্রেমিক ছিলেন। আশির দশক। তখন এ খেলার বেশ কদর ছিল। ভালো খেলতেন বিধায় ইদ্রিস আলীর ডাক পড়ত বিভিন্ন অঞ্চলে। কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই দিতেন ছুট। দক্ষিনাঞ্চলের মাঠ সহ ভাওয়াল, রাজেন্দ্রপুর, মধুপুর, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মাঠে ফুটবল খেলেছেন ইদ্রিস আলী। সেই ইদ্রিস আলীর খেলা এখনও শেষ হয়নি। তাঁর হয়ে খেলছেন তার ৫ ছেলে। বড় ছেলে লিটন সব সময় বলেন,বাবা পাশে ছিলেন বলেই আমরা ৫ ভাই খেলোয়াড়। বাবাকে কখনওই বলতে শুনিনি আমাদের ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। বরং খেলার মধ্য দিয়েই বাবা আমাদের বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার না হলেও আমরা ভালো আছি।

ইদ্রিস আলীর ৫ ছেলেই এখন দেশ সেরা ফুটবলার। বাবা ও বড় ভাই লিটনের প্রেরনায় ওরা পাঁচ জনই একে একে ফুটবলার হয়ে ওঠে। প্রথম দিকে বড় ভাই লিটনের নাম ছড়িয়ে পরে সর্বত্র। লিটন ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে ঢাকার শান্তিনগর ক্লাব থেকে খেলা শুরু করে সে। পরে ব্রাদার্স ক্লাবের হয়ে দীর্ঘ বার বছর সুনামের সাথে ফুটবল খেলেছেন। বাবা ইদ্রীস আলীর ইচ্ছায় লিটন অন্য ৪ ভাইকে ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য উৎসাহ যোগান। বাবার ইচ্ছাও সফল হতে লাগলো। লিটনের মতো ইদ্রিস আলির অন্য ছেলেরাও আজ দেশ সেরা ফুটবলার।
শুধু দেশেই নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ফুটবলের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এই পাঁচ ছেলে। দেশের এমন কোন জেলা নেই যেখানের মাঠে গিয়ে তারা ফুটবল খেলেননি। খেলা নিয়ে ব্যাস্ততার কারনে এক সঙ্গে পাঁচ ভাইয়ের বাবার কাছে আসা হয় না খুব একটা। তবে ঢাকায় গিয়ে ছেলেদের খেলা দেখেন এই গর্বিত বাবা।
নিজ জেলা বলে কথা, যে কোন ফুটবল খেলার টুর্নমেন্টে ডাক পড়লে ছুটে আসতে বললে কখনওই কার্পন্য করেন না তারা। এই পাঁচ সন্তান নিয়ে গর্বের শেষ নেই বাবা ইদ্রীস আলী সরদারের। তিনি বলেন, ফুটবল খেলা একদিন আমার নেশা ছিল। এর কারনেই আমাকে চাকরি পর্যন্ত হারাতে হয়েছিল। আমি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খেলেছি। তখন বিকেএসপির সুযোগ ছিল না। কিন্তু বড় ছেলে লিটনকে নিয়ে চেষ্টা করেছি। লিটন তার মেধা যোগ্যতায় ঠিকই জায়গা করে নিয়েছে। বড় ভাই লিটনের দেখাদেখি ছোট চার ভাইও ফুটবল খেলায় উৎসাহী হয়। এরা খেলার জন্য যখন যা খেলার জন্য চেয়েছে আমি তা দিয়েছি। দুই ছেলে এমিলি ও শাকিল জাতীয় দলসহ অন্যরা দেশের সেরা ক্লাব গুলোতে জায়গা করে নিয়েছে। এদের মধ্যে এমিলি দেশ সেরা ষ্ট্রাইকার। ওদের পায়ে যখন গোল হয়। সবাই যখন আনন্দ উল্লাস করে পিতা হয়ে আমার তখন যে কি আনন্দ, আমি তা ভাষায় বলে বোঝাতে পারবো না। আমার প্রিয় খেলা ছেলেরা ধারণ করেছে। সুনাম অর্জন করেছে। আমি মনে করি আল্লাহ আমায় পরিপূর্ন পিতার গৌরব দিয়েছেন।
এই পরিবারটি এলাকার মানুষের কাছে ফুটবল পরিবার নামে পরিচিত। ফুটবলের বিকাশে এলাকার অন্য খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষনসহ উদ্দিপনা যোগান এই পাঁচ ভাই। এ বিষয় বড় ভাই লিটন বলেন, আমরা চাই এই জেলায় আরও ফুটবলার তৈরী হোক। এ লক্ষে এ পর্যন্ত এলাকার প্রায় পনের জন ছেলে আমাদের মাধ্যমে ঢাকার তয় ও ২য় বিভাগে খেলার সুযোগ পেয়েছে।এমিলি, শাকিলের খেলা আমাকে মুগ্ধ করে লিটনের। তিনি বলেন, আমার চোখে ব্রাদার্সের হয়ে মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে এমিলির দেয়া একটি গোল ঢাকা মাঠের সেরা গোল। আর ওই গোলটাই এমিলির জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। আরও একবার পাকিস্তানের মাঠে ভারতের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আকর্ষনীয় একটি গোল করেছিল। আর শাকিল ফুটবলের অনেক চৌকশ খেলোয়াড়। আমি জানতাম শাকিল একদিন জাতীয় দলে জায়গা করে নেবে আর সে তা নিয়েছেও। এমেকা আছে মোহামেডানে।ওর খেলাও ভালো আশা করছি এমেকাও এবার ঘুরে দাড়াবে। সবার ছোট সাব্বির। ও বিকেএসপির হয়ে আন্ডার সিক্সটিন জাতীয় দলের হয়ে খেলছে। আশাকরি ছাব্বিরও জাতীয় দলের হয়ে খেলবে। আর সাব্বির বলেন, এত সব কিছুর অবদানের পেছনের মানুষটা আমার বাবা ও বড় ভাই।

ইদ্রিস আলী বলেন, আমার ছেলেরা ফুটবলে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে । এদের মধ্যে লিটন ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব থেকে অবসর নিয়ে ( বর্তমানে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের কর্মকর্তা), শাকিল জাতীয় দল ও শেখ জামাল,এমিলি জাতীয় দল ও শেখ রাসেল, এমেকা মোহামেডান ও সাব্বির আন্ডার নাইনটিন জাতীয় দল। বিশ্বয়ের ব্যাপার হল। এই পাঁচ ভাইয়ের একই পরিবারে জন্ম এবং এরা একই মায়ের সন্তান। এতে আমার পাশাপাশি ওদের মা হাওয়া বেগমের অবদান কম ছিলো না।

ইদ্রিস আলীর ৫ ছেলের এক স্বপ্ন এই অঞ্চলে ফুটবলের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য একটি ফুটবল একাডেমী গড়ে তুলবে। তারা চান তার বাবা বেঁচে থাকতেই গড়ে উঠুক এ একাডেমি।
এ ব্যাপারে দেশ সেরা ষ্ট্রাইকার এমিলি বলেন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা ক্রীড়া বিকাশের কাজ করছে না। বাবা ও বড় ভাইর মাধ্যমে চেষ্টা করছি কিছু খেলোয়াড়দের বিকেএসপি ও ঢাকায় সুযোগ করে দেয়ার। বলতে লজ্জা লাগে খেলাধূলার চর্চার অভাবে আমাদের জেলার ছেলেমেয়েরা নেশার জগতে বিচরণ করছে। এ জেলায় দু’একটা টুর্নামেন্ট ছাড়া দির্ঘ ১৮-২০ বছর ফুটবল লীগ হয়না। জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে অনুরোধ জানাবো একটু উদ্যোগী হতে।

ইদ্রিস আলির স্ত্রী হাওয়া বেগম বলেন, আমার স্বামী এই এলাকার নাম করা ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। মাঠে নামতেন দলকে জিতিয়ে পুরস্কার নিয়ে ঘরে ফিরতেন। তখন অদ্ভুত এক আনন্দ হতো। ছেলেদের তিনি খেলায় উৎসাহ দিতেন। সন্তানের জন্য তার প্রথম পুরস্কারই ছিলো ফুটবল। আজ যখন টেলিভিশনে ছেলেদের খেলা দেখি, দেশ-বিদেশের মানুষ দেখে গর্বে তখন বুকটা ভরে ওঠে।
সাবেক ক্রীড়া সংগঠক নুরুল হুদা আলম বলেন, ইদ্রিস ভাই শুধু আমাদের এলাকার নন। তিনি দক্ষিনাঞ্চলের গর্ব। সবাই মিলে তাঁর স্বপ্ন এই জেলায় একটি ফুটবল একাডেমি গড়ে তুললে এই পরিবার যুগ যুগ এলাকার অহংকার হয়ে বেঁচে থাকবে।

print