জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য সম্পন্ন করে রায় কার্যকর করার ব্যাপারে বর্তমান সরকারের শতভাগ অঙ্গীকারাবদ্ধ।
‘নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী শেখ হাসিনার সরকার ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা রয়েছে। তাই আমরা দেখতে পাই এত বছর পরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। রায় হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে দুই জনের ফাঁসিও হয়েছে। তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করার ব্যাপারে বর্তমান সরকারের শতভাগ কমিটমেন্ট রয়েছে,’ রাজধানীর ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্পিকার আজ একথা বলেন।
একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন (১৯৬১-১৯৭১)’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা দেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ সংগঠন ছায়ানটের সভাপতি অধ্যাপিকা সন্জিদা খাতুন।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক কামাল লোহানী, হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ-এর সভাপতি অধ্যাপক অজয় রায়, বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এবং ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
ড. শিরীন বলেন, যুদ্ধাপরাধ আমাদের হিউম্যান ডিগনিটির মূলে আঘাত করে। এজন্যই এটি ক্রাইম এগেইন্সট হিউম্যানিটি। যা মানুষ হিসেবে আমাদের মানবিক মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে। এটি এমনই অপরাধ যা জাতীয় অস্তিত্বকে বিলীন করে দেয়। আমাদের বুঝতে হবে আমাদের জাতি সত্ত্বাকে সমুন্নত রাখতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনিবার্য।
তিনি বলেন, একটি ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ গঠনেও যুদ্ধাপরাধীদেও বিচার অনিবার্য। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হলে আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছেও জবাবদিহি করতে হবে।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির বিভিন্ন কর্মকান্ডের ধারাবাহিকতায় আজ যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, বাঙালির ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সমস্যা ও সংকটে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এ ধারা নিরন্তর। তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে এই আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে হবে। তিনি এ ব্যাপারে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
কামাল লোহানী যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদন্ড করার দাবি জানিয়ে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি হতে হবে একমাত্র মৃত্যুদন্ড। যেখানে বাংলাদেশের মাটিতে তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত আজো প্রবাহিত হচ্ছে, সেখানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে এত দীর্ঘ করার কোন মানে হয় না। তারা যখন দেশের মানুষকে হত্যা করেছে তখনতো তারা ক্ষমা করেনি, আপিল করার সুযোগ দেয়নি।
তিনি ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান। তিনি এটি আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির জন্য জাতিসংঘে প্রেরণেরও সুপারিশ করেন।
অধ্যাপক অজয় রায় অভিজিৎসহ জঙ্গীদের হাতে নিহত ব্লগারকে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান এবং বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এবছর ফেব্রুয়ারিতে একুশের বইমেলা থেকে ফেরার পথে টিএসএসসিতে জঙ্গীদেও হাতে নিহত ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ অধ্যাপক অজয় রায়ের পুত্র।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার দেশ ভালোই চালাচ্ছেন। কিন্তু একের পর এক ব্লগার হত্যার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আজো দেয়া হয়নি। তিনি ব্লগার হত্যাকীদের অবিলম্বে শনাক্ত করে তাদের দ্ষ্টৃান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন এখনও প্রাসঙ্গিক এই জন্য যে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক কর্মীরা তাদের অবস্থান বদল করেননি। এজন্য ছায়ানটকে জাহানারা ইমাম স্মৃতি পদক প্রদান করে দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীদের সম্মান দেয়া হয়েছে।
তিনি অধ্যাপক মামুন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সাহসী পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিএনপি-জামাত সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মানুষের মনোজগতে যে প্রভাব বিস্তার করেছে সরকারকে সেই স্থান দখল করতে এবং মুক্তিযুদ্ধেও চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ দমন, মাদ্রাসা শিক্ষায় জাতীয় ইতিহাস বাধ্যমতামূলক করার আহ্বান জানান।
জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে এবছর একজন ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান করা হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীর আন্দোলনে তাত্বিক অবদান এবং মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য অধ্যাপক অজয় রায় এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দেলনে অসামান্য অবদানের জন্য ছায়ানটকে জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক ২০১৫ প্রদান করা হয়।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অধ্যাপক অজয় রায় এবং ছায়ানট সভাপতি সন্জিদা খাতুনের হাতে সম্মাননাপত্র তুলে দেন এবং সম্মাননা স্মারক পরিয়ে দেন।

print