কারণে-অকারণে স্ত্রী নাজনীন আক্তার তন্বীকে নির্যাতন করতেন বলে স্বীকার করেছেন বেসরকারি গাজী টেলিভিশনের (জিটিভি) বার্তা সম্পাদক রকিবুল ইসলাম মুকুল। এছাড়াও স্ত্রীর বোনের স্বামী অর্থাৎ ভায়রার কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা নেয়েছিলেন বলেও পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন তিনি।

গ্রেফতার হওয়ার পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদকালে তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মুকুল স্বীকার করেন বলে বাংলানিউজকে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাসুদ পারভেজ মুকুল।

এসআই মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘মুকুল রিমান্ডে স্বীকার করেছেন তিনি মাঝেমাঝে তার স্ত্রীকে মারধর করতেন। তবে তার দাবি, তার স্ত্রী দৈনিক জনকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নাজনীন আক্তারও তাকে মারধর করতেন।’

মাসুদ পারভেজ আরো জানান, মুকুলের ভাষ্যমতে, তিনি মোট ২৬ লাখ টাকা তার ভায়রাকে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা নাকি মুকুলের কাছ থেকে মোট ৬০ লাখ টাকা দাবি করেন। তাই এ টাকা পরিশোধ করতে পারেননি তিনি।

য়ৌতুকের জন্যে মারধরের বিষয়ে বাদীপক্ষ তথ্য-প্রমাণাদি পুলিশের কাছে দিতে পারলে দ্রুত এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন পুলিশের এ তদন্ত কর্মকর্তা।

তদন্তসূত্রে পুলিশ জানায়, ২০০৮ সালে স্ত্রীর বোনের স্বামীর কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে পূর্বাচলে ৭ কাঠা জমি কিনেছিলেন রকিবুল ইসলাম মুকুল। এ টাকা দেওয়ার শর্ত ছিলো, ওই জমি থেকে তিন কাঠা জমি ভায়রার নামে লিখে দেবেন মুকুল।

কিন্তু তা না করে গত এপ্রিল মাসে স্ত্রী তন্বীকে না জানিয়ে পুরো জমি বিক্রি করে দেন মুকুল। পরে স্ত্রী তন্বী তা জানতে পেরে তার কাছে থেকে টাকা চাইলে তিনি টাকা দিতে অস্বীকার করেন। এ নিয়েও স্ত্রী তন্বীকে নির্যাতন করতেন তিনি।

পুলিশ আরো জানায়, স্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অন্য একজনের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন মুকুল। ওই নারী হচ্ছেন ঢাকা ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার রাজিউল আমিনের স্ত্রী মামলার আরেক আসামি মেহেরুন বিনতে ফেরদৌস।

কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে পরকীয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে মুকুল জানিয়েছেন, মেহেরুন তার বন্ধু। তার সঙ্গে কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মামলার বাদিনী নাজনীন আক্তার তন্বী বলেন, কয়েক বছর আগে আমাদের ছোট মেয়ে মারা যায়। এরপর থেকেই মেহেরুনের সঙ্গে ওর (মুকুল) সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং আমার ওপর শারীরিক নির্যাতনও বেড়ে যায়। আমাকে মারধর করার সময় ওই নারীকে ফোন দিয়ে শব্দও শোনাত মুকুল।

মুকুলের কাছে ৬০ লাখ টাকা চাওয়ার কথা অস্বীকার করে তন্বী বলেন, আমি শুধু আমার বোনের স্বামীর কাছ থেকে নেওয়া ১৪ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলেছি। কিন্তু ও সেটা দিতে রাজি হয়নি, উল্টো অস্বীকার করেছে।

মামলার আরেক আসামি মেহেরুন বিনতে ফেরদৌসের স্বামী রাজিউল আমিন বাংলানিউজকে বলেন, কিছুদিন আগে মুকুলের সঙ্গে তার (মেহেরুন) প্রেমের সম্পর্কের কথা জানতে পারি। এরপর আমার স্ত্রীকে বার বার বোঝানোর চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি। অবশেষে গত ১৫ দিন আগে বাবার বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

মেহেরিনের ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) নাজনীন আক্তার তন্বী তার স্বামী রকিবুল ইসলাম মুকুল ও মেহেরুন বিনতে ফেরদৌস নামের আরেক নারীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও যৌতুকের অভিযোগে মিরপুর মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

শুক্রবার (২৬ জুন) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে সেগুনবাগিচা থেকে মুকুলকে (৩৭) গ্রেফতার করে মিরপুর থানাপুলিশ। আদালতের অনুমতি নিয়ে শনিবার (২৭ জুন) একদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে।

মামলায় নাজনীন আক্তার তন্বী অভিযোগ করেছেন, ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর একমাত্র মেয়ে চন্দ্রমুখী মারা যাওয়ার পর শোকে তিনি পাঁচতলা থেকে লাফ দিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হন। এরপর দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলেন। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তারা দু’জন আবার সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু এর মধ্যে তার স্বামী মুকুল মেহেরুন বিনতে ফেরদৌসের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ নিয়ে কথা বললে মুকুল বিভিন্ন সময়ে অন্তঃসত্ত্বা নাজনীনকে শারীরিক নির্যাতন করেন। মুকুল তাকে কয়েকবার নির্যাতন করার সময় ফোনে মেহেরুনকে শুনিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন নাজনীন।

একবার রক্তাক্ত অবস্থায় সহকর্মীরা বাসা থেকে তন্বীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। এর কিছুদিন পর তার দ্বিতীয় কন্যার জন্ম হয়। কিন্তু সন্তানের জন্মের পর থেকে কখনোই খোঁজ নিতেন না মুকুল।

তন্বীর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে মুকুল তার কাছ থেকে টাকাও নিয়েছেন। সর্বশেষ রাজউকে পূর্বাচলে বরাদ্দ পাওয়া একটি প্লটের কিস্তির জন্য তিনি ১৪ লাখ টাকা দেন মুকুলকে। কিন্তু মুকুল ওই প্লটটি নিজের নামে লিখে নেন এবং সম্প্রতি সেটা বিক্রিও করে দেন। এসবের প্রতিবাদ করায় নাজনীনকে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন করেন মুকুল।

print