জর্ডানের মাটি শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) এর পদধূলি পেয়েছিল। যদিও তা ছিল তাঁর নবুয়তের আগে। সিরাতে ইবনে ইসহাক এবং ইবনে হিশামের পর্যালোচনামূলক আলোচনা অনুযায়ী মক্কায় মুহাম্মদ (সা.) এর জন্মের সময় অথবা তার কিছুদিন আগে এক ঘটনা ঘটে। যায়েদ আমর বিন নুফায়েল নামক এক মক্কাবাসী সত্যপথের সন্ধান পাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন। তিনি আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্ধ ধর্মবিশ্বাস নিজ হাতে তৈরি মূর্তির উপাসনা, মূর্তির জন্য বলিদান, সামাজিক জীবনে মক্কাবাসীর মারামারি কাটাকাটি হানাহানি ইত্যাদিতে অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত ছিলেন। তিনি দ্বীনে ইবরাহিম বা সত্য পথের সন্ধান লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। এই সত্যপথের অনুসন্ধানের জন্য তিনি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন। মক্কা থেকে সুদূর সিরিয়ায় গমন করেন এবং ইরাক সফর করেন।
বলা বাহুল্য, শেষ নবীর আবির্ভাবের আগেকার নবী ছিলেন ঈসা (আ.)। ধর্ম ছিল খ্রিস্টান। এ ধর্মের ধর্মযাজকরা ছিলেন পাদ্রি। তিনি এসব দেশ সফর করে ধার্মিক ও পাদ্রিদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। তাদের কাছে সত্য ধর্মের সন্ধান লাভের চেষ্টা করেন। সত্য দ্বীন খুঁজে বেড়ান।
জর্ডানের বালকা এলাকায় তার সঙ্গে এক পাদ্রির দেখা হয়। সেই পাদ্রি তাকে বলেন, অতি শিগগিরই এক নবীর আবির্ভাব হবে, যিনি দ্বীনে ইবরাহিম নিয়ে আসবেন। এ ভবিষ্যদ্বাণীর সময় অথবা তার কিছু দিন পরই শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন।
বালক বয়সে মুহাম্মদ (সা.) তাঁর চাচা আবু তালেবের সঙ্গে ব্যবসায়ী সফরে তৎকালীন শাম দেশ সফর করেন। এই সফরে তাদের সঙ্গে দেখা হয় বাহিরা নামক এক পাদ্রির, অতঃপর দেখা হয় নিস্তর নামক আরেক পাদ্রির। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, পাদ্রি বালক মুহাম্মদকে দেখে চিনতে পারেন এবং তাঁকে ঘরে নিয়ে আপ্যায়ন করেন। ঐতিহাসিক ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, সে স্থানটি জর্ডান এলাকায় অবস্থিত।
আরও বর্ণিত আছে যে, এ ব্যবসায়ী সফরে রাসুল (সা.) তাঁর চাচার সঙ্গে একটি বৃক্ষের নিচে বিশ্রাম করেন। মনে করা হয়, বৃক্ষের নিচে এ বিশ্রামের সময়ই নিস্তর নামক পাদ্রি তাঁকে দেখেন এবং ভবিষ্যৎ নবী হিসেবে চিনে ফেলেন।
জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে সাফাবি নামক স্থানে এই বৃক্ষটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে এই বৃক্ষটি আছে তা হলো একান্তই মরুভূমি। কাছে কোনো পানি নেই। জলাশয় নেই। কয়েকশ’ কিলোমিটার পর্যন্ত ঘুরলেও গাছ বা বৃক্ষের সন্ধান পাওয়া যাবে না। অথচ এই একটিমাত্র বৃক্ষই এখানে দাঁড়িয়ে আছে। কমপক্ষে এর বয়স ১ হাজার ৫০০ বছর।
এখানে দাঁড়ালে সত্যিই অনেক কিছু মনে পড়ে যায়।
বৃক্ষটি ১ হাজার ৫০০ বছরের ইতিহাস বলে যাচ্ছে। এ বৃক্ষ সম্পর্কে জর্ডানের যুবরাজ মুহাম্মদ গাজী এক ভিডিও বার্তায় কথা বলেছেন। সেখানে তিনি এই বৃক্ষটিকে রাসুলের একমাত্র জীবিত সাহাবি বলে বর্ণনা করেছেন। সাহাবি হলেন তারা, যারা রাসুলকে স্বয়ং স্বদেহে দেখেছেন, যেসব সাহাবি তাঁকে দেখেছেন, তাদের সবাই মারা গেছেন। এই বৃক্ষটির সঙ্গে মহানবীর দেখা হয়েছে। কাজেই তিনি তাঁর সাহাবি, যা এখনও জীবিত। এ কারণেই বৃক্ষটিকে মহানবীর একমাত্র জীবিত সাহাবি বলা হয়েছে। এটা রূপক অর্থ।
এ ঘটনা ছিল মহানবীর নবুয়তের আগের। এখানে তাঁর নবুয়তকালীন হাতের পরশও আছে। মদিনা হিজরতের পর নবগঠিত রাষ্ট্রকে সুসংহত করার পরই তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রদূত পাঠান। কারও কারও কাছে তিনি উপঢৌকন পাঠান। পত্র পাঠান। কাউকে তিনি তাঁর বয়ে আনা দ্বীনের কথা বলেন। দ্বীনের দাওয়াত দেন। তাঁর মিশনের ব্যাখ্যা করেন। জানাতে চেষ্টা করেন।
সেকালে জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। এক দেশে অন্য দেশের দূতাবাস ছিল না। এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ব্যবস্থা ছিল না। কোনো নতুন দেশ প্রতিষ্ঠিত হলে অন্য দেশ কর্তৃক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা চালু ছিল না। এর পরিবর্তে তখন ছিল দূতের মাধ্যমে সম্পর্ক সৃষ্টি, উপঢৌকনের আদান-প্রদান, চিঠিপত্রে যোগাযোগ ইত্যাদি।
মহানবী ছিলেন একজন নিরক্ষর রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় তাঁর কাছে হার মানে প্রজ্ঞাবান পন্ডিত ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমরবিদ্যা ও সমরকৌশলেও তিনি সীমাহীন প্রজ্ঞা ও পা-িত্যের স্বাক্ষর রাখেন। সুতরাং মদিনার রাষ্ট্রগঠনের পরই তিনি বিভিন্ন দেশ ও সাম্রাজ্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য চিঠিপত্র লেখান। দূত পাঠান। উপঢৌকন পাঠান। তাঁর লেখা চিঠিগুলো হারিয়ে গেছে।
কালের আবর্তে আসলে দেড় হাজার বছর আগের প্রামাণ্য দলিল খুব কমই পাওয়া যায়। তবে মহানবীর লেখা দুইটি চিঠি রক্ষা পেয়েছে। তিনি লিখতে পারতেন না। তাহলে তিনি চিঠি লিখলেন কীভাবে? আজকের যুগে সে লেখার অর্থ বোঝা কঠিন নয়। লেখা মানে শুধু লেখা নয়। লেখা মানে লেখা। লেখা মানে লেখানো। মহানবীর বক্তব্যও অন্যরা লিখতেন। তিনি তাতে দস্তখতও করতে পারতেন না। কাজেই তিনি সিল দিতেন। সেই সিল আংটির মতো তাঁর আঙুলে লাগানো থাকত। তিনি সেই আঙুল চেপে সিল লাগিয়ে দিতেন। এটাই তাঁর দস্তখত।
লেখক : ভিসি

এশিয়ান ইউনির্ভাসিটি অব বাংলাদেশ

print