ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. নূনযীরুল মোহসেনীন মীমকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য মন্ত্রী বর্তমানে সিঙ্গাপুরে রয়েছেন। রোগী ও স্বজনের সঙ্গে ডা. মীমের দুর্ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পেরে সেখান থেকেই বৃহস্পতিবার মন্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
বৃহস্পরোগী ও রোগীর স্বজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বৃহস্পতিবারও ডা. মীমের অপসারণ এবং তার সনদ বাতিলের দাবি জানিয়েছে। এদিন রাজধানীতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কুষ্টিয়ায় ডা. মীম সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানকার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে থাকাকালেও তিনি প্রতিনিয়ত রোগীদের সঙ্গে দুর্বব্যবহার করতেন। এমনকি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা প্রদানকালেও তার রূঢ় ব্যবহারের শিকার হয়েছেন রোগী ও স্বজনরা। বুধবার ডা. মীমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে রোগীর স্বজনের সঙ্গে অসদাচরণের দায়ে কেন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না- তা তিন দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়। তিবার রাত পর্যন্ত ডা. মীম এ নোটিশের জবাব দেননি। এরই মধ্যে ঢামেক হাসপাতালে এক ওয়ার্ডবয় ঘুষি মেরে এক রোগীর স্বজনের দাঁত ফেলে দিয়েছে। এ নিয়ে ওই ব্যক্তি বৃহস্পতিবার শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানান, একজন চিকিৎসকের এ ধরনের আচরণের বিষয়টি অবগত হয়ে বৃহস্পতিবার ক্ষুব্ধ হন মন্ত্রী। তিনি (মোহাম্মদ নাসিম) সিঙ্গাপুর থেকে ফোন করে মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ডা. মীমের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রী আজ শুক্রবার দেশে ফিরবেন। দেশে আসার পর তার আরও কঠোর শাস্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন- যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের আচরণ করার ধৃষ্টতা না দেখায়।
ডা. মীমে ক্ষুব্ধ সবাই : কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, ঢামেকের আলোচিত চিকিৎসক নূনযীরুল মোহসেনীন মীমের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। বাবা ডা. নাজির হোসেন চৌধুরী ও মা সাজেদা চৌধুরীর ১১ সন্তানের মধ্যে মীম সবার ছোট। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর হলেও অনেক দিন ধরেই তারা ঢাকার আশুলিয়ায় থাকেন। মীমের বাবা ও ভাইয়েরা সবাই ফরিদপুরের আটরশি পীরের মুরিদ। তাদের অধিকাংশ সময় কাটে বনানীতে আটরশি হুজুরের খানকায়। শ্বশুর পরিবার জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্বামী ডা. সামিউর রহমান শিবুও কুষ্টিয়ায় জামায়াতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত।
২০০৭ সালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর বিসিএস (স্বাস্থ্য) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ডা. মীম। চাকরিজীবনের প্রথম পোস্টিং হয় শ্বশুরবাড়ি কুষ্টিয়ায়। শ্বশুরের বাসা কুষ্টিয়া শহরের ১৮/১, মীর মশাররফ হোসেন সড়কে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেশীরা জানান, মীম অত্যন্ত বদ মেজাজী। কথায় কথায় শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন। পুত্রবধূ মীমের দুর্ব্যবহারের কারণে অল্প দিনের মধ্যেই শ্বশুর-শাশুড়ি বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন।
২৫০ শয্যা কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে মীমের ডিউটি পড়ত। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মতোই হাসপাতালেও রোগী ও স্টাফদের সঙ্গেও চরম অসদাচরণ করতেন ডা. মীম। মীমের দুর্ব্যবহারে অল্প দিনের মধ্যেই রোগী এবং হাসপাতালের স্টাফরা ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ আসতে থাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছেও। ডা. মীমের কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও প্রায়ই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো।
সার্জিক্যাল ওয়ার্ডের ৯ ও ১০নং (পুরুষ ও মহিলা) ওয়ার্ডে ডিউটি থাকলেও ডা. মীম বেশির ভাগ সময় ১০নং পুরুষ ওয়ার্ডে সময় কাটাতেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিনিয়র নার্স ও পুরুষ ওয়ার্ডের এক আয়া জানান, কথায় কথায় রেগে যাওয়া ছিল ডা. মীমের স্বভাব। সেবা পেতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়তেন তিনি। পরে রোগী ও তাদের স্বজনদের শান্ত করতেন হাসপাতালের অন্য ডাক্তার ও স্টাফরা।
প্রায়ই ডা. মীম হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকতেন। বেশিরভাগ সময়ই কুষ্টিয়া শহরের কলেজ মোড়ে ন্যাশনাল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল সার্ভিসেসে প্রাইভেট রোগী দেখতেন। এ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার সজল জানান, ম্যাডাম এখানেও রোগীদের সঙ্গে কথায় কথায় খারাপ আচরণ করতেন। এক কথা একবারের বেশি দুবার জানতে চাইলেই রেগে যেতেন।
কুষ্টিয়াতে চাকারকালীন ডা. মীম বেশ কয়েকটি ভুল অপারেশনও করেছেন। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি কুষ্টিয়া এবং শ্বশুরের পরিবার প্রভাবশালী হওয়ার সুবাদে বারবার পার পেয়ে গেছেন। হাসপাতালসংলগ্ন টালিপাড়া এলাকার ওষুধ ব্যবসায়ী রুবেল জানান, পা ভেঙ্গে যাওয়ায় তিনি কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে ভর্তি হন। ডা. মীম তার সঙ্গেও চরম দুর্ব্যবহার করেন।
কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আজিজুন নাহার  জানান, ডা. মীমের মধ্যে সব সময় ইগো প্রবলেম কাজ করত। চিকিৎসা সেবা যে নবেল প্রফেশন তা তিনি ভুলে গেছেন। ডা. আজিজুন নাহার আরও জানান, আমাদের দেশে মেডিকেলে পড়াশোনার সময় রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে একজন চিকিৎসকের কি ধরনের আচরণ করা উচিত তা সেখানো হয় না। মেডিকেল থেকে পাস করে সরকারি ডাক্তার হিসেবে চাকরি পেয়ে তার ভেতর সব সময় হাম বড়া ভাব কাজ করে। তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করেন।

মানববন্ধন : ডা. মীমের অসদাচরণ, সাধারণ রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়ে বৃহস্পতিবার জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং পুরান ঢাকার সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ফোরাম মাবববন্ধন করে। এতে বক্তব্য দেন জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটির সভাপতি আল-আমিন মিরাজ, সাংবাদিক তারেক হোসেন বাপ্পী, নজরুল ইসলাম রানা, শিল্পী ইসলাম, দোহারের জয়পাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ মোয়াজ্জেম হোসেন, ভাইস প্রিন্সিপাল তাপস কুমার নন্দী, ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মো. সিদ্দিকুর রহমান, দোহার উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ডা. আলাউদ্দিন আল আজাদ, সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলীম।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ডা. মীম ও তার স্বামী ডিউটি ফাঁকি দিয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে রোগী দেখেন। তারা কুষ্টিয়ায় জামায়াতে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ও জামায়াতের অর্থদাতা। তারা ঢাকায় স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নাম ভাঙিয়ে ঢামেক হাসপাতালে পোস্টিং নিয়েছে। এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করে সাধারণ রোগী ও মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডা. মীমের সনদ বাতিল ও তাকে বরখাস্তের দাবি জানান তারা।

print