মশিউর রহমান রাহাত : “তোদের যা দেই তাই খা,তোরা এতিমের বাচ্চা, মাগনা যা পাও তাতেই শুকুর কর।” ন্যায্য খাবার দাবী করলে এতিমদের সাথে এ ভাষায়ই কথা বলেন পিরোজপুর শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক ও শিক্ষকরা। এ পরিবারের শিক্ষকদের দীর্ঘদিন নানা রকম বঞ্চনার স্বীকার হওয়া শিশুরা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করলে তাদের উপর নেমে আসে নির্যাতন। উশৃঙ্খল, চরিত্রহীন অপবাদ দিয়ে কিছু মেয়েদের বহিস্কার করে দেয়া হয়। যাতে অন্য মেয়েরা আর কোন দাবীর কথা না বলে। কিন্তু বদলে যায় প্রেক্ষাপট। ৫ থেকে ১৭ বছরের ৭০জন শিশুই প্রতিবাদি। তাদের কয়েক দফা লিখিত অভিযোগ আসার পর সরেজমিনে শিশু পরিবারে গেলে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র।
১৯ টি পদ থাকলেও কর্মকর্তা কর্মচারী মাত্র ৮ জন। ৮ জনের ৪ জন রয়েছেন ডেপুটেশন। তাঁরা মাঝে মধ্যে আসেন আবার অন্যত্র চলে যান। উপ-তত্ত্বাবধায়ক পদে ৭ বছর ধরে আছেন মতিউর রহমান। তিনি একা জেলার গুরুত্বপূর্ন চারটি পদের দায়িত্বে আছেন। শিশু পরিবার ছাড়াও কাজ করছেন  উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা, শহর সমাজসেবা কার্যালয় এবং হাসপাতালে সমাজ সেবায়ও। ৭০ জন শিশুর অনুকুলে কোন বাবুর্চি নেই। সদনের মধ্যে স্বামী শিশু সন্তান সহ বাস করেন শিক্ষক ফেরদৌসি বেগম, তার বাসার কাজকর্ম রান্না-বান্না শিশু পরিবারের মেয়েদেরই করতে হয়। তার স্বামী এলজিইডির ওয়ার্ক অ্যাসিটেন্ট হেমায়েত হোসেন মেয়েদের অসাবধানতা বশতঃ চলাফেরার ছবি মোবাইল ধারন করে হয়রানি করেন। পরিবারের মেয়েরা বাই রোটেশনে তার বাসার কাজকর্ম করে দেয়। বাবুর্চির দায়িত্ব মেয়েরা নিজেরাই পালন করে। ৭ থেকে ১০ বছরের শিশুদের দেখা গেল মশলা পিসে কোটা বাটা করে রান্নার আয়োজন করছে। দগদগে উনুনে লোহার বিশাল কড়াইয়ে রান্না করছে পাতলা করে মাত্র ৫০০ গ্রাম ডাল ও ৩টি বয়লার মুরগী। যার একটির ওজন হবে এক থেকে দেড় কেজি। গত মঙ্গলবার সকালে ছিল নিন্মমানের চালের ভাতের সাথে ডাল, দুপুরে সামান্য মুরগির মাংস। রাতে নিরামিষ কাচাকলা। যার রান্না বান্না ধোয়া মোছা সবকিছু শিশুরা নিজেরাই করে। এরপর প্রতিনিয়ত ভেতরে থাকা তিন শিক্ষকের গালমন্দ তিরস্কার শুনতে হয় নিয়মিত। স্থানীয় কয়েকজন নারী নেত্রী এবং সাংবাদিকদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে অনেকই। ভেতরে ছাই চাপা আগুন চোখে মুখে বিদ্রোহ তাদের। অভিযোগ যেন আর ফুরায়না। সমস্বরে সকলে জানায় পচা চাল দেয়, গন্ধে আমারা খেতে পারিনা। আমাদের খাতাপত্র, জামা-কাপড়, খাবার সব কিছুতেই বঞ্চিত করে। আমরা কেউ প্রতিবাদ করলে চরিত্রহীন, বেশ্যা বলে গালি দেয়। পরিবার থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়। এই পর্যন্ত আমার ৬ জন বড় বোনকে বের করে দিয়েছে। এলাকায় তাদের নামে বদনাম দিয়ে এসছে এখন তারা আত্মাহত্যা করতে চায়। আমাদের মারতেও এরা দ্বিধা করে না। প্রায়ই আমাদের মারে। এ সময় তারা জানায় সরকারের দেয়া চাল, ডাল, দুধ, তেল সবকিছু এরা আমাদের কমিয়ে দেয়। বছরে একদিন ভাল খাবার দিলে ৬দিন খারাপ খাবার দিয়ে পুষিয়ে নেয়। প্রশিক্ষনের শিক্ষক প্রশিক্ষন দেয়াতো দুরের কথা আমাদের সাথে কথাও বলেন না। কোন অভিযোগ দিতে গেলে শিক্ষকরা আমাদের সুয়ারবাচ্চা ,হারামির বাচ্চা এতিমের বাচ্চা বলে গালি দেন। সব কথা জানিয়ে আমরা ডিডি স্যারের কাছে দরখাস্ত দিয়েছিলাম। শিক্ষকরা ভিতরের পুরানো বিশাল আকৃতির প্রায় ১৭টি গাছ গোপনে বিক্রী করে দেন। যার মূল্য হবে কয়েক লক্ষ টাকা। আমাদের হাতে কুড়াল ও শাবল দিয়ে গাছের গোড়া থেকে শিকড় উপরাতে বলে। ভিতরে ফলের গাছে যেসব ফল হয় তা কখনও আমাদের ধরতে বা খেতে দেয় না। একটি টেলিভিশন আছে তাও দেখতে দেয় না। সবসময় আমাদের সাথে পশুর মত আচরণ করে। এসব কারনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তাতে আমাদের সকলের স্বাক্ষর ছিল কিন্তু শাস্তি দিয়েছে আমাদের বড় বোনদের। বড় ৬ জন বোনকে যারা সব সময় আমাদের আগলে রাখতো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বের করে দিয়েছে ।
শিশু পরিবারের ৬ জনকে বিশৃঙ্খলার অভিযোগে বের করে দেয়া হয়েছে গত ১৫দিন আগে। এ ৬ ছাত্রী শিশু পরিবার থেকে রেবিয়ে মহিলা পরিষদে লিখিত অভিযোগ করে। তাতে তারা জানায়, আমাদের অভিভাবককে ও জানায়নি, পরিবার থেকে একটি ইজি বাইকে তুলে পাঠিয়ে দিয়েছে, অভিভাবকরা কারন জানতে চাইলে বলেছে এই মেয়েদের চরিত্র খারাপ। এলাকার লোকদেরও একথা বলেছে। ৬ জনের মধ্যে একজন জেসমিন আক্তার এ এস টি একাডেমির ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী কালের কণ্ঠকে জানায়, বিনা কারণে আমাদের বের করে দিয়েছে। বাড়ির এলাকার লোকজনদের কাছে আমাদের নামে বদনাম দিয়ে এসেছে। মানুষকে মুখ দেখাতে পারি না এর চাইতে উনারা আমাদের মেরে ফেল্লেই ভাল হতো।
ভিতরে বাইরে এতিম শিশুদের চোখের পানি ঝড়ছে। কিন্তু এতে মন গলছেনা কর্মকর্তাদের। ৭০জন এতিম শিশুদের লিখিত অভিযোগ শিক্ষক হৃদয় খানমের নিজ জেলা পিরোজপুরে হওয়ায় তিনি শিশুদের সাথে সব সময় খারাপ আচরন করেন। ভয় দেখান নানা হুমকি দেন। স্কুলে গেলে ভারাটে বখাটে আমাদের পিছনে লেলিয়ে দিয়ে আমাদের ক্ষতি করবেন বলে ভয় দেখান । বেশ্যা বলে গালি দেন। একথা তত্বাবধায়ককে জানালে, তিনি বলেন তোরাতো বেশ্যাই, ম্যাডাম ঠিকই বলছে। একথা শিক্ষক গোলাম কবির ও ফেরদৌস বেগমকে জানাতে গেলে তারাও মারধোর করেন। হুমকি দেন সবগুলারেই চরিত্রহীন বলে বের করে দিব। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে চাই এরা আমাদের জোকের মত চুষে খাচ্ছে। আমাদের সাথে হিং¯্র আচরণ করছে।
এদিকে এসব বিষয় সম্পূর্ন অস্বীকার করেন শিক্ষিকা হৃদয় খানম সহ অন্য শিক্ষক গোলাম কবির ও ফেরদৌসী বেগম। স্বামী সন্তান নিয়ে নিয়ম আছে বলেই পরিবারের ভিতরে থাকেন বলে জানান ফেরদৌসী বেগম। তার স্বামী মেয়েদের ছবি তোলার বিষয়টিও অস্বীকার করেন। উপতত্ত্বাবধায়ক মতিউর রহমান বলেন, বিধি মোতাবেক ছাত্রীদের বের করে দেয়া হয়েছে। যা করেছি তা পরিবারের অভ্যন্তরীন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য করেছি। খাবার দাবার সরবরাহ করেন কন্ট্রাকটর কে আমি অনুরোধ করে মান সম্মত খাবার দেবার কথা বলেছি। এ ব্যপারে খাবার সরবরাহের ঠিকাদার নাসির উদ্দিন বলেন, সিডিউল অনুযায়ী আমি নিয়মিত খাবার সরবরাহ করি। সেখান থেকে চুরি হয়ে গেলে আমারতো কিছু করার নাই।
৩ বছর ধরে সিডিউলে যা আছে আমি চেষ্টা করেছি। তাছাড়া তদারকির জন্য ৩ জন কর্মকর্তা রয়েছে। কিন্তু মেয়েরা জানায় তিন মাস তারা মাথায় নারিকেল তৈল দেয়া না যে তেল দেওয়া হয় তা নি¤œমানের হওয়ায় তারা তা ফিরিয়ে দেয়। সরেজমিনেও সে চিত্র দেখা যায়। কিন্তু এ সব ব্যপারে তিনি কোন মন্তব্য করতে চাননি। সরেজমিনে এসব ঘটনা পর্যবেক্ষনের প্রত্যক্ষদর্শী নারী উন্নয়ন সংস্থা সূচনা ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়াম্যান সালমা রহমান হ্যাপী বলেন, বাচ্চা মেয়েদের উনুনে রান্না করার যে দৃশ্য দেখলাম তা রীতিমত ভীতিকর। যে কোন সময় যে কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মহিলা পরিষদের সভাপতি মনিকা মন্ডল বলেন, প্রতি শিশুর মাথা প্রতি সরকারি বরাদ্দ ২৬শ টাকা। কিন্তু যা দেখলাম তাতে মনে হয় না ১৫শ টাকা খরচ করছে কর্তৃপক্ষ। এর একটা প্রতিকার হওয়া দরকার। নইলে বিক্ষুব্ধ শিশুরা আরও বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। একদিকে পেটে খাবার নাই অন্য দিকে কর্তৃপক্ষের দুর্র্ব্যবহারে এদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত পিরোজপুর শিশু পরিবারের মূল ভবনটিও হয়ে রয়েছে পরিত্যাক্ত। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ সুনজর না দিলে যে কোন সময় ঘটতে পারে অঘটন।

print