নিউজ ডেক্স : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বছরের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি)-২০৩০ কে একটি সম্মিলিত যাত্রা হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এটি বাস্তবায়নের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি এবং অভ্যস্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ সকল উৎস থেকে আমাদেরকে সম্পদ সংগ্রহ করার প্রয়োজন হবে। অন্যথায় ওডিএ’র লক্ষ্য পূরণ করতে শুরু থেকেই খুবই সমস্যা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখানে জাতিসংঘ সদর দফতরে আয়োজিত এমডিজি ও এসডিজি’র উপর এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। ৭০ তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি বাংলাদেশের উদ্যোগে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। শেখ হাসিনা বলেছেন, এমজিডি অর্জনের মতো এসডিজি’ও অর্জন করে বাংলাদেশ আরো একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই যাত্রায় কেউ পিছিয়ে থাকবে না। আমরা বাংলাদেশকে একটি প্রগতিশীল, শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধশালী দেশ গড়ার প্রত্যাশা করি। তিনি বলেন, প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন ও জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক সমর্থন প্রয়োজন। বাংলাদেশে বিশেষ করে স্বাস্থ্য, কৃষি, জ্বালানি ও পরিবহনের মতো সেক্টরগুলোতে পরিবেশ উপযোগী প্রযুক্তি প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে নেদারল্যান্ডের রাজা উইলিয়াম আলোক্সান্ডার, বেনিন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বোনিইয়া’ই, সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টীফ্যান এল ফেভেন, সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট মোগেনস লেকেটোফট, ইউএনডিপি’র প্রশাসক মিস হেলেন ক্লার্ক, ইউএন আন্ডার সেক্রেটারী জেনারেল এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধি গায়ান চন্দ্র আচারিয়া এবং বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত মাহমুদ মহিউদ্দিন বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি উন্নয়ন বিস্ময় দেশ হিসেবে উল্লেখ করায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রগতি হয়েছে। অনেক উন্নয়ন চিন্তাবিদদের ধারণা বাংলাদেশ ভুল প্রমাণিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী এমডিজি অর্জনের সাফল্যের কারণ সম্পর্কে বলেন, এমডিজি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ এমডিজি’র কাঠামোর আলোকে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সমন্বয় করেছিল। আমরা চেয়েছিলাম, আমাদের জাতীয় প্রত্যাশা পূরণে এমডিজি’র লক্ষ্য যেন আমাদেরকে সহায়তা করতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা আমাদের জাতীয় সম্পদ সংগ্রহ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছি। আমাদের জনগণকে ক্ষমতায়ন করেছি। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক ভিত্তির মাধ্যমে অংশীদারিত্বে সম্পৃক্ত করেছি। শেখ হাসিনা বলেন, এমডিজি’র সময় বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। মৌলিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিগত ছয় বছরে বৈশ্বিক মন্দাবস্থা সত্ত্বেও আমাদের জিডিপি ৬ শতাংশের বেশি ছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত দশকে দেশের রফতানি তিনি গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংকের নি¤œ মধ্যম আয়ের মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের অঙ্গীকার। আমরা জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের, অটিজম এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধিসহ অতিদরিদ্র লোকদের রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি। তিনি প্রযুক্তিকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে বলেন, আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল কেন্দ্র থেকে দু’শতাধিক সেবা গ্রহণ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইটি সংযোগ সুবিধাসহ ১৬ হাজার ৫শ’ কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন পরিষদ স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে জনগণ স্বাস্থ্য সুবিধা পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনতান্ত্রিক সুবিধা পেতে বাংলাদেশ তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। সরকার সকলের জন্য বিশেষ করে নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি নারীর কল্যাণে গৃহীত কর্মপরিকল্পনার দু’টি উদাহরণের কথা উল্লেখ করেন। এর একটি হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের ১৩.৪ মিলিয়ন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান,এদের মধ্যে ৭৫ ভাগ মেয়ে এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের লেখা-পড়া অবৈতনিক করে দেয়া। এতে স্কুল ঝরেপড়া উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি সরকার এ বছর ১ জানুয়ারিতে সারাদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৩৪ মিলিয়নের বেশি বই বিতরণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কৃষিতে আমাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছি। বাংলাদেশ কৃষি বিভাগ আমাদের উন্নয়নের মূল চলিকাশক্তি হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন হচ্ছে বর্তমান কৃষির একটি স্মারক। আমরা জলবায়ু পরিবর্তিত পরিস্থিতিসহিষ্ণু শস্য উদ্ভাবন করেছি। আমরা খাদ্য উৎপাদনে স্বাবলম্বী তা অর্জন করেছি এবং বর্তমানে বিদেশে চাল রফতানি করছি। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এজেন্ডা-২০৩০ এর জন্য আধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে। আমরা এমডিজি’র অর্জন ধরে রাখতে চাই। এর সাফল্য দিয়ে আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে চাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সকল জাতীয় পরিকল্পনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করেছে। এর অংশ হিসেবে পরিকল্পনা কমিশন নতুন বৈশ্বিক এজেন্ডা নিয়ে পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০১৬-২০২০) প্রণয়ন করছে। তিনি এই পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন ও সমন্বয় নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সমন্বয় কৌশল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।

print