স্টাফ রিপোর্টার : মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের সাব- সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ মারা গেছেন। তিনি  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জেল হত্যা মামলার  সাক্ষী । ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সাথে জড়িত সুন্দরবনের বাঘ খ্যাত স্বাধীনতার এ বীর সেনানী শুক্রবার সকালে  সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। মৃতুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে দক্ষিনাঞ্চলের এক জীবন্ত কিংবদন্তির অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো। পারিবারিক জীবনে তিনি ২ পুত্র ও ২ কন্যা সন্তানের জনক।

জানা যায় , প্রায় ২ বছর ধরে জিয়াউদ্দিন আজমেদ লিভার সিরোসিসে ভুগছেন। প্রায়ই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন। সর্বশেষ ১ জুলাই অসুস্থ হওয়ার পর তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে সিঙ্গাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার অন্যতম সাক্ষী এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর  সেক্টরের সুন্দরবন অঞ্চলের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ। মুক্তিবাহিনীর জেড  ফোর্সের অধীনে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বীরত্বের সঙ্গে সুন্দরবন অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত রাখার জন্য তাকে সুন্দরবনের ‘মুকুটহীন স¤্রাট’ বলা হয়। সুন্দরবন রক্ষার জন্য তিনি ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। কখনও  জেলেদের নিয়ে, কখনও প্রশাসনের সহায়তায় ওই অঞ্চলে ডাকাত নির্মূলে তিনি ভূমিকা পালন করেন। ডাকাতরা কয়েকবার তাকে হত্যার চেষ্টা করে।

জিয়াউদ্দিন আহমেদ ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। ১৯৬৮ সালে তিনি পিরোজপুর মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ১৯৬৯ সালে পিরোজপুর সোহরাওয়ার্দী কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
৭১’র সালের ২০ মার্চ সেকেন্ড লেফটেনেন্ট হিসেবে ছুটিতে বাড়ি আসেন এবং ২৭ মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। প্রথমে তিনি পিরোজপুর শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন এবং সুন্দরবনে ঘাঁটি স্থাপন করে। এ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অধীনে সাব সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হয়ে সুন্দরবনেই সদর দফতর স্থাপন করে যুদ্ধ পরিচালনা শুরু করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমে ক্যাপ্টেন ও পরে মেজর পদে পদোন্নতি পান।
ঢাকায় ফিরে কর্নেল তাহেরর নির্দেশে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ৭৬’র সালের জানুয়ারি মাসে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার দূর্গম মাঝের চর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে কর্নেল তাহেরসহ মেজর জিয়া এবং জাসদ নেতৃবৃন্দের বিচার হয়। এ বিচারে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি এবং মেজর জিয়াকে যাবজ্জীবনসহ অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। ৮০ সালে তিনি সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান এবং জাসদে যোগ দেন। ১৯৮৩ সাল থেকে তিনি সুন্দরবনে দুবলার চরে মাছের ব্যবসা শুরু করেন এবং জেলেদের আর্থিক নিরাপত্তা, জলদস্যু দমন, দুর্যোগ মোকাবেলায় সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণসহ বিভিন্ন সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৮৯ সালে পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন । তিনি ছিলেন ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম ভাবে হত্যার ঘটনার হওয়া মামলার সাক্ষী । এছাড়া  জেল হত্যা মামলারও সাক্ষী ছিলেন তিনি।
এদিকে তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ.ম. রেজাউল করিম, পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য আলাহজ্ব মো: হাবিবুর রহমান মালেক, জেলা উদীচী সভাপতি এ্যাডভোকেট এম এ মান্নান, পিরোজপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মসিউর রহমান মহারাজ সহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, পিরোজপুর প্রেসক্লাব, দৈনিক গ্রামের সমাজ পরিবারও  বিভিন্ন সংসঠনের নেতৃবৃন্দ।

print