স্বাধীনতাসংগ্রাম শেষে বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য একমনে কাজ করছিলেন, তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেট তাঁকে জনগণের কাছ থেকে শারীরিকভাবে কেড়ে নেয়। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট স্বাধীন বাংলার সবুজ ঘাস তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়। বাঙালির ইতিহাসের নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডে বাংলার আকাশ-বাতাস-নিসর্গ প্রকৃতিও যেন অশ্রুসিক্ত হয়। শ্রাবণের ঝরনাধারা আর বাঙালির অশ্রুধারা একাকার হয়ে যায়। এ কথা সত্য, দেরিতে হলেও এ দেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তি হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি প্রকৃত অর্থেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই, তাহলে তাঁর গরিবহিতৈষী উন্নয়ন কৌশলকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে এই আগস্ট আমাদের শোকের মাস। বঙ্গবন্ধুকে হারানো শুধু বাঙালির জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি। কেননা তিনি ছিলেন সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের এক অনাবিল অনুপ্রেরণার উৎস। আজ বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁর নিজের শ্রমে-ঘামে-রক্তে গড়া তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশের বিস্ময়কর রূপান্তরের কথা বলতে চাই। স্বাধীনতার পর পর শত সহস্র প্রতিকূলতার মধ্যে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ির’ অপবাদ মুছে ফেলে আজ পৃথিবীর সামনে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের এক রোল মডেল। মাত্র চার দশক পরই বাংলাদেশ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ।

দ্রুতই উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশটির ম্যাক্রো-অর্থনীতির যুগান্তকারী পরিবর্তন ও দ্রুত দারিদ্র্য নিরসন এবং মানবিক উন্নয়ন আসলেই অবাক করার মতো এক উপাখ্যান। এসব কিছুই হতো না যদি বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হতো এই ভূখণ্ডে। বাল্যকাল ও কৈশোর থেকে সংগ্রাম শুরু করা বঙ্গবন্ধু সারা জীবন একটিই সাধনা করেছেন, আর তা হচ্ছে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠ করলেই বুঝতে পারি কী অসীম সাহসী, গভীর স্বদেশপ্রেমিক, সুনিশ্চিত লক্ষ্যভেদী এবং জনদরদি এক ভূমিপুত্রের জন্ম হয়েছিল এই অভাগা দেশে। ক্ষণজন্মা এই মহামানব আজ টুঙ্গিপাড়ায় শুয়ে থাকলেও আছেন তিনি বাংলাদেশজুড়েই। রয়েছেন তিনি আমাদের নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে।

পাকিস্তান সৃষ্টির গোড়া থেকেই শাসকগোষ্ঠীর কোনো অন্যায়কে বঙ্গবন্ধু বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দেননি। মূলত অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, প্রতিবাদ করাই ছিল তাঁর স্বভাব। ধাপে ধাপে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি। আর হাসিমুখে বরণ করেছেন জেলজীবনের শত কষ্ট ও সীমাহীন দুঃখ। আখেরে হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের মহানায়ক। কালক্রমে মুক্তিসংগ্রামের এক মহৎ প্রচ্ছদপট এঁকে বাঙালি জাতির জন্য এনে দেন স্বপ্নের স্বাধীনতা। তিনি নিজে পরিশ্রমী কর্মী ছিলেন। কর্মী থেকে হয়েছেন বিচক্ষণ সংগঠক। সংগঠক থেকে হয়েছেন অতুলনীয় নেতা। নেতা থেকে জাতীয় নেতা এবং সবশেষে হয়েছেন জাতির পিতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু নিরন্তর দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেছেন। মৃত্যুকে তুচ্ছ ভেবে তিনি এগিয়ে গেছেন অবিচল চিত্তে। ফাঁসির মঞ্চ সামনে রেখে গেয়েছেন বাঙালির জয়গান। এ জন্যই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ। লাল-সবুজের পতাকায় তিনি হয়ে আছেন চিরস্মরণীয়, বরণীয়।

অতুলনীয় এই জাতীয় বীর নিরলস সংগ্রামের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। স্বাধীন দেশের নেতা হিসেবেও তিনি আজীবন বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করে গেছেন। বাংলার মানুষের প্রতি ভালোবাসার মর্যাদা তিনি রক্ত দিয়ে পরিশোধ করে গেছেন। তিনি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সর্বদাই তিনি নির্যাতিত, শোষিত, হতদরিদ্র, মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা ভাবতেন। আর এই ভাবনার প্রতিফলন দেখতে পাই তাঁর প্রতিটি কর্মে ও চিন্তায়। বাংলার গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবেন, সোনার বাংলা গড়বেন—এটাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা—এই মৌলিক অধিকারগুলো পূরণের মাধ্যমে বাংলার মানুষ উন্নত জীবন পাবে, দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে, বেকারত্ব দূর হবে—সেই ভাবনাই তাঁকে আজীবন তাড়া করে বেড়াত।

তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, কৃষির উন্নতি ছাড়া এ দেশের মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসতে পারে না। কৃষকরাই এ দেশের প্রাণ। কৃষির প্রবৃদ্ধি ঘটলে দারিদ্র্যের হার দ্রুতলয়ে কমে—এ কথাটি তিনি জানতেন। তাই তাদের কল্যাণে তিনি বরাবরই নিবেদিত ছিলেন। তিনি ভাবতেন, তাঁর সোনার বাংলায় মানুষ পেটভরে ভাত খাবে, শিশুরা হাসবে, মায়েরা মর্যাদায় আসীন হবে, সবাই সুবিচার পাবে। সেই সোনার বাংলা বাস্তবায়নের লক্ষ্য সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সদ্য স্বাধীন দেশে ৩০ লাখ টন খাদ্যঘাটতি পূরণ করতে তাত্ক্ষণিক আমদানি, স্বল্পমেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ, কৃষিঋণ বিতরণ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার এবং কৃষকের মাঝে খাসজমি বিতরণ করে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা করেছেন তিনি। কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। উচ্চতর কৃষি গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৭৩ সালের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করতে সক্ষম হন তিনি। পাকিস্তানি শাসনামলের ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি ও তাদের সব ঋণ সুদসহ মাফ করে দেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরদিনের জন্য রহিত করেন। পরিবারপিছু জমির সিলিং ১০০ বিঘায় নির্ধারণ করেন। শক্তিচালিত সেচ পাম্পের সংখ্যা বাড়ান। বিশ্ববাজারে সারের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সামাল দিতে সারে ভর্তুকির ব্যবস্থা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আমরা যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যাত্রার দিকে নজর দিই, তাহলে দেখতে পাই বঙ্গবন্ধুর নেওয়া দরিদ্রবান্ধব ও কৃষি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন মাত্রায় রক্ষা করে গেছে তাঁর পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারগুলো। আর সেই সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। আর এ কারণেই আমাদের উন্নয়ন হয়েছে অন্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক, অর্থাৎ আমরা কাউকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাইনি। আজ একথা সবাই মানছেন যদি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করা হতো, যদি তাঁর উন্নয়ন অভিযাত্রা অব্যাহত রাখা যেত তাহলে নিশ্চিতভাবে আজ আমরা আরো বহুগুণে এগিয়ে থাকতাম। হয়তো আরো আগেই মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হতো বাংলাদেশ।

স্বাধীনতাসংগ্রাম শেষে বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলদেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য একমনে কাজ করছিলেন, তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেট তাঁকে জনগণের কাছ থেকে শারীরিকভাবে কেড়ে নেয়। পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট স্বাধীন বাংলার সবুজ ঘাস তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়। বাঙালির ইতিহাসের নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডে বাংলার আকাশ-বাতাস-নিসর্গ প্রকৃতিও যেন অশ্রুসিক্ত হয়। শ্রাবণের ঝরনাধারা আর বাঙালির অশ্রুধারা একাকার হয়ে যায়। একথা সত্য, দেরিতে হলেও এ দেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তি হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি প্রকৃত অর্থেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে চাই, তাহলে তাঁর গরিবহিতৈষী উন্নয়ন কৌশলকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির ও একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আমাদের ধ্যানে, ত্যাগে, শ্রমের মাধ্যমে সত্যি করতে হবে। নিঃসন্দেহে আজকের বাংলাদেশ ওই পথেই হাঁটছে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রায় দুই কোটির মতো মানুষ এখনো অতিদরিদ্র। তাদের জীবনের মান এখনো দুর্বিষহ। অনেকেরই কর্মসংস্থান নেই। এদের জন্য তাই আমাদের আরো অনেক কিছুই করার আছে।

বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, ‘এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি আমার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি যুবক শ্রেণি চাকরি না পায় বা কাজ না পায়। ’ দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমেই তিনি লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে সফল করতে চেয়েছিলেন। আজ দেশ চালানোর ভার তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাঁধে। যদি আজকের উন্নয়ন পরিকল্পনার দিকে দেখি, সেটা রূপকল্প ২০২১ হোক বা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, আমরা বঙ্গবন্ধুর কথাগুলোরই প্রতিফলন দেখতে পাই। বঙ্গবন্ধুর সচেতন ও কৃষকদরদি নীতির কারণে কৃষিক্ষেত্রে যে অগ্রগতি সূচিত হয়েছিল তারই ফলে আজ কৃষিক্ষেত্রে শক্তিশালী ধারা সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কৃষিভাবনার আলোকেই বর্তমান সরকার কল্যাণধর্মী ও কৃষকবান্ধব উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করেছে। সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রকৃত কৃষক, বর্গাচাষি ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণসেবাসহ আধুনিক ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কৃষকের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণয়ন করা হচ্ছে যুগোপযোগী কৃষি নীতিমাল।

বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষের সংগ্রামী চরিত্রের ওপর আস্থা রাখতেন, আর তাই তারা যেন নিজেরা কাজ করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টি করতে ছিলেন বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে তাই একটি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার সুফল দরিদ্রতম মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সচেষ্ট ছিলেন। বর্তমান সরকার তারই ধারাবাহিকতায় দারিদ্র্য বিমোচনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জায়গায় রেখেছে; দারিদ্র্যের হার এখন ২৩ শতাংশে এবং অতিদারিদ্র্যের হার ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে ও আশা করা হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে দেশ প্রকৃত অর্থেই অতিদারিদ্র্যমুক্ত হবে। বঙ্গবন্ধু স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন। বর্তমান সরকারও বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহার করে, বিশেষত ব্যক্তি খাতের সঙ্গে যুগপৎ কাজ করার মাধ্যমে উন্নয়নের কৌশল বেছে নিয়েছে।

পরিশেষে এ কথা বলা যায়, আমাদের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এবং আমাদের উন্নয়ন কৌশলে আমরা বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ও স্বপ্নেরই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের সামনের পথ মোটেও মসৃণ নয়। আগেই যেমনটি বলেছি, এখনো এ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থেকে আবারও দারিদ্র্যে পতিত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে আরো অনেক মানুষ। আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষি খাতের জোরদার ভূমিকা নিশ্চিত করতে এ খাতে বার্ষিক উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখাও একটি চ্যালেঞ্জ। রপ্তানি আয়ের জন্য শুধু ইউরোপ-আমেরিকার ওপর নির্ভর না করে আশপাশের দেশগুলোতে রপ্তানি পণ্যের জন্য নতুন বাজার তৈরি করা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চীনের বিরাট বাজারে আমাদের রপ্তানি পণ্য পৌঁছানোর যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তার সদ্ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বাড়তি নীতি প্রণোদনা প্রদানের প্রয়োজন রয়েছে। এই মুহূর্তে জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ বিনিয়োগে যাচ্ছে, এই অনুপাত অন্তত ৩৪ শতাংশে উন্নীত না করা গেলে ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাপক অর্জন থাকলেও, এখনো এগুলো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিরাজ করছে। সর্বোপরি কর সংগ্রহ, আর্থিক খাত, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ব্যবসার ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ অর্জনের জন্য কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে আমাদের সামনে যেমন অসংখ্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে, ঠিক তেমনি এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর দেখানো গরিবহিতৈষী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে এগোলেই আমরা সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। এখন বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা দরকার, ঠিক যেমনটি আমরা করতে পেরেছিলাম ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। নেতৃত্বের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি কথা খুবই প্রণিধানযোগ্য। তিনি তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, ‘নীতিহীন নেতা নিয়ে অগ্রসর হলে সাময়িকভাবে কিছু ফল পাওয়া যায়, কিন্তু সংগ্রামের সময় তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায় না। ’ তাঁর এই ভাবনার সঙ্গে মিল রেখেই আমরা বলতে পারি যে আজকের আর্থ-রাজনৈতিক সংগ্রামকে সফল করতে হলে চাই নীতির প্রশ্নে নীতিবান আপসহীন নেতৃত্ব। চাই বঙ্গবন্ধুর আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম নেতৃত্ব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাধ্যমতো সেই মানের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তবে তাঁর এই উন্নয়নের সংগ্রামকে আরো দ্রুত এগিয়ে নিতে হলে পুরো জাতিকেই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। হাতে হাত ধরে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সেটা করা সম্ভব হলেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রকৃত অর্থে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে। তখনই আমরা বলতে পারব, জাতির জনকের ঋণ শোধ করতে আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করেছি।

লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

print