স্টাফ রিপোর্টার : মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান অ্যাডভোকেট এম এ মান্নান পিরোজপুর বাসীর কাছে এক জীবন্ত কিংবদন্তি । ৫২র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের এক অগ্রপথিক। ৭১’র স্বাধীনতা সংগ্রামে এই অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও একত্রিত করে প্রশিক্ষণ দেয়া ও অস্ত্র সরবরাহ করাসহ অনেক গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। চোখের সামনে যেমন দেখেছেন অত্যাচার অনাচার তেমন দেখেছেন মৃত্যুর নির্মমতা। এই অঞ্চলের মানুষের কাছে পেশায় একজন তুখোর আইনজীবী এম এ মান্নান আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রভাগে থাকা এক অসাধরন ব্যক্তিত্ব।
১৯৪৫ সালে ১৫ অক্টোবর পিরোজপুর শহরের ঝাটকাঠী এলাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মে ছিলেন এম এ মান্নান। পিতা মরহুম মুজাফ্ফর আলী হাওলাদার এবং মাতা মৃত বেগম সখিনা খাতুনের সাত সন্তানের মধ্যে বড় সন্তান এম এ মান্নান সেই কিশোর বয়সেই এলাকার ভাষা সৈনিকদের সাথে মিছিলে যোগ দিয়ে রাজ পথে নেমে ছিলেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে। তার পর আর আন্দোলনের মাঠ ছাড়া হয়নি এই উদ্যোমি বালকের। ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন করতে গিয়ে প্রথম কারাবরণ করেন তিনি। ৬৯ এর গণঅব্যুথ্যান আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে নিয়েছিলেন বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। ৭১’র মার্চে বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৯ নং সেক্টরের সুন্দরবন সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর (অবঃ) জিয়া উদ্দিনকে সাথে নিয়ে পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলেছিলেন একটি সু-সংগঠিত মুক্তি বাহিনী। পরে ৯ মাসের যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে পশ্চিম বঙ্গের হাবড়া কল্যাণগড় মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষন ক্যাম্পের সহকারী পরিচালক ও পলিটিকাল মোটিভেটরের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও থেমে থাকেননি তিনি । সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চাসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে থেকে দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন সমানভাবে। রাজনৈতিক জীবনে ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে মহকুমা,জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ পদে থেকেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ৪ বছর মহকুমা রেডক্রসের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৭২ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর পিরোজপুর মহকুমা ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যক্ষা নিরোধ সংস্থা (নাটাব)’র জেলা সভাপতি, গোপলকৃষ্ণ টাউনক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সহ সভাপতির দায়িত্ব সহ শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। মহকুমা ও জেলা শিশু একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ মান্নান সমাজ সেবামুলক সংগঠন এপেক্স ক্লাব অব বাংলাদেশের আজীবন সদস্য, পিরোজপুর এপেক্স ক্লাবের সভাপতি এবং এপেক্স জেলা-৫ এর গভর্ণর এর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পিরোজপুর শেরে বাংলা পাবলিক লাইব্রেরীর বর্তমান সহ সভাপতি এম এ মান্নান পিরোজপুর মহিলা কলেজের ( বর্তমান সরকারী মহিলা কলেজ) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, জেলা আইনজীবী সমিতির ৪ বার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও ১ বার সভাপতি নির্বাচিত হন। স্বৈরাচার বিরোধী গণ আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি ১৯৮৭-৮৮ সালে আবার কারাবরণ করেন। যুদ্ধাপরাধীদেরর বিচারের দাবীতে গণজাগরণ মঞ্চের পিরোজপুর জেলার মুখপাত্র হিসেবে তিনিই দায়িত্ব পালন করেন। দেশের নোংরা দলাদলির রাজনীতি থেকে নিজেকে দুরে সরিয়ে রেখে কু-সংস্কারচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থাকে পরিবর্তন, সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে যুব সমাজকে মাদকাশক্তি থেকে দুরে রাখার জন্য একুশে পদক প্রাপ্ত জাতীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী পিরোজপুর জেলা সংসদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৬২ থেকে অদ্যাবধি এ এলাকায় বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘুর্ণিঝড়সিডর, মহামারী সহ সবধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় ত্রান তৎপরতা সহ সকল প্রকার কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়েছেন। বিভিন্ন সমাজ সেবা মুলক কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ ২০১৬ সালে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজ কল্যান মন্ত্রনালয়ের জাতীয় কমিটির সদস্য মণোনিত হন এম এ মান্নান। শ্রেষ্ঠ সংগঠক, শ্রেষ্ঠ অভিভাবক, শ্রেষ্ঠ ক্রীড়া সংগঠক, শ্রেষ্ঠ সমাজ সেবক হিসেবে তিনি একাধিক পুরস্কার লাভ করেছেন। ক্রীড়া ক্ষেত্রে অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক ডিপ্লোমা সনদ লাভ করেন তিনি।একজন সফল আইনজীবী এম এ মান্নান পারিবারিক জীবনেও একজন সফল পিতা। তার এক মেয়ে ও এক ছেলে সমাজ সংসারে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। এম এ মান্নান সরকারী ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারত সহ কয়েকটি দেশ সফর করেছেন তিনি।কেটে গেছে তার জীবন থেকে ৭৩টি বসন্ত। জীবন সায়াহ্নে এসে তার আর চাওয়া পাওয়ার বেশী কিছু নেই। তারই প্রস্তাবিত শহরের বলেশ^র নদীর তীরে শহিদস্মৃতি ঘাট যেখানে হাজারো শহীদের আর্তনাদ ধ্বনিত হয়েছিল সেই ঘাটটির আধুনিকায়ণ করার জন্য দাবী জানান তিনি।
বয়স তাকে ছুঁয়ে দিলেও মনে প্রাণে তিনি এখনও যেনো চির নবীন। মুক্তিযুদ্ধ থেমে গেলেও দেশ ও সমাজ বির্নিমানের যুদ্ধে এখনও তিনি অগ্রপথিক। সহযোদ্ধারা মনে করছেন এখনও তৈরি হয়নি তার মত বিকল্প মানুষের। যে পিরোজপুরের যুব সমাজকে তার মতো করে দিকনির্দেশনা দিতে পারবে। যে পারবে এই মৌলবাদী, কুসংস্কারচ্ছন্ন সমাজটাকে পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখি,সুন্দর সোনার বাংলা গড়তে।
এম এ মান্নান সম্পর্কে বলতে গিয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার, সাংবাদিক গৌতম চৌধুরী বলেন, মান্নান ভাইয়ের শেষ ইচ্ছা বলেশ^র ঘাটের বধ্যভুমির স্মৃতিসৌধটি আগামী বছর স্বাধীনতা দিবসের আগেই আধুনিকায়ন করে একটি সূদৃশ্য স্মৃতি সৌধ নির্মান করে তাকে দিয়েই আমরা উদ্বোধন করবো। তিনি বলেন, আমরা যারা পিরোজপুরে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার চেস্টা করছি, তাদের আদর্শ পুরুষ এম এ মান্নান। তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন তিনি আলোরদ্যূতি ছড়িয়ে সমাজকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেবেন। মান্নান ভাই আমাদের মাথার ওপর ছাতার মত ছায়া দিয়ে রেখেছেন, আর এ ভাবেই আরো দীর্ঘদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থেকে আমাদেরকে ছায়া দিয়ে রাখবেন এই কামনা করছি।

print