দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলাদেশের পথ মাড়িয়ে আর কোনো দেশ পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। স্নায়ু যুদ্ধকালীন ওই বৈশ্বিক সঙ্কটকালে ভারতের দুর্বল সমর শক্তি ও পাকিস্তানের ঔদ্ধত্ব্যের মাঝে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ’৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকার মাটিতে পা রেখে তাজউদ্দীন আহমদকে জড়িয়ে ধরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি জানতাম, তাজউদ্দীন, কেউ পারলে তুমিই পারবা’।

তাজউদ্দীনের যুদ্ধ ছিল তার নিজের সঙ্গেও। সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার সদস্যরা বলেছিলেন দেশ স্বাধীন না করে কেউ পারিবারিক জীবন-যাপন করবেন না। বস্তুত আর কোনো মন্ত্রিসভার সদস্য সেই শপথ রক্ষা করেননি।

সত্যিই তাজউদ্দীন পেরেছিলেন। অচিন্ত্যনীয় যোগ্যতা দেখিয়ে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দেশ স্বাধীনে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই নেতৃত্বের আড়ালে যে কত আঘাত তাজউদ্দীনকে ক্ষত-বিক্ষত করেছিল তার সামান্যই আমরা জানতে পারি। কালজয়ী সেই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জন্মদিন আজ।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পাকিস্তানের তরফ থেকে আসেনি। এসেছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের যুব-ছাত্র নেতৃত্বের মধ্য থেকে। বুকে পাথর বেঁধে সেসব বিরোধিতা সহ্য করছিলেন তিনি। বিরোধিতাকারী সেই শিবিরের থেকে তাজউদ্দীনকে মারার জন্য কলকাতায় তার অফিসে গুপ্তঘাতক পাঠিয়েছিল। ঘাতক তাজউদ্দীনের রুমে কাঁপতে কাঁপতে হাতে ছুড়ি নিয়ে ঢুকে নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন।

স্বীকারোক্তিতে সেই ঘাতক বলেন, অন্য কেউ গুপ্তঘাতকের দায়িত্ব পেলে হয়তো আপনাকে মেরে ফেলবে। তাই আমি আপনাকে মেরে ফেলার দায়িত্ব নিয়ে সতর্ক করতে এসেছি। পরবর্তী সময়ে প্রকাশ পেলেও যুদ্ধকালে তাজউদ্দীন এই ঘটনা কারও কাছে বলেননি। এতে পাকিস্তান শিবিরে বাংলাদেশ সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যাবে। এই ছিল তাজউদ্দীন আহমদের বৈশিষ্ট্য।

নিজ দলের বাইরে থেকেও প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রথম সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে পথ চলতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালে মস্কোপন্থী বাম দলগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত প্রথম থেকেই নিয়েছিল। পিকিংপন্থীরা ছিল দ্বিধাবিভক্ত, এদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগকে সমর্থন না করে নিজেদের মতো উদ্যোগ নিতে চেয়েছিল।

ব্যতিক্রম ছিলেন মওলানা ভাসানী। গবেষক কামাল হোসেন ‘তাজউদ্দীন আহমদ: বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তারপর’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মস্কোপন্থীদের মতো চীনপন্থীরাও আলাদাভাবে ট্রেইনিং ও অস্ত্র দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল।

তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাজউদ্দীন আহমদের উত্তর ছিল বুদ্ধিদীপ্ত যুদ্ধমন্ত্রীর মতো। তাজউদ্দীন তাদেরকে বলেছিলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিতে কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কাদেরিয়া বাহিনী, হেমায়েত বাহিনীর উদাহরণ দিয়ে তাজউদ্দীন বলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে কারও অনুমতির তোয়াক্কা করেনি।

মার্কসিজম সম্পর্কে আমরারও কিছু পড়াশোনা করেছি। শত্রুর অস্ত্রই হচ্ছে মার্কসিস্ট গেরিলাদের অস্ত্র। দুনিয়ার ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো চীনপন্থী মার্কসিস্টরা অস্ত্রের জন্য মুজিবনগরের পেটিবুর্জোয়া সরকারের কাছে দরখাস্ত করেছে। এটা কেমন করে সম্ভব?

চীনপন্থী এ উদ্যোক্তাদের আরও কঠোর ভাষায় তাজউদ্দীন বলেন, আমি পেটিবুর্জোয়া আওয়ামী লীগ সরকারের এমন ‘আহম্মক প্রধানমন্ত্রী’ নই যে, আপনার হাতে অস্ত্র তুলে দেব, কিছু দিন পরে সেই অস্ত্র আমারই বুকের ওপর চেপে ধরবেন। আপনাদের মতবাদ সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল আছি। বাংলাদেশের যুদ্ধ সম্পর্কে আপনাদের থিসিসগুলো ইতোমধ্যেই আমি পড়ে দেখেছি।

এই ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। এক দিকে যুদ্ধ করছেন পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে শুধু নিজ দল ও দলের বাইরের চাপ সহ্যই করছেন না, সেই সঙ্গে তারা অর্ন্তনিহিত কী চিন্তা করছেন সেই খবরও রাখছেন। তাজউদ্দীন জানতেন, চীনপন্থীদের হাতে অস্ত্র গেলে সেটি পশ্চিমবঙ্গে ওই সময়ে চলমান নকশালবাড়ি আন্দোলনের সঙ্গে মিলে যাবে। যা নিয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীসহ রাশিয়া পর্যন্ত চিন্তিত ছিল।

নিজের সঙ্গে যুদ্ধ
পাকিস্তান, নিজ দল, বাইরের দল। শুধু এই শক্তিগুলোর সঙ্গেই যুদ্ধ করেছিলেন তাজউদ্দীন? না, তাজউদ্দীনের যুদ্ধ ছিল তার নিজের সঙ্গেও। সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার সদস্যরা বলেছিলেন দেশ স্বাধীন না করে কেউ পারিবারিক জীবন-যাপন করবেন না। বস্তুত আর কোনো মন্ত্রিসভার সদস্য সেই শপথ রক্ষা করেননি। অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন তাজউদ্দীন। যুদ্ধ চলাকালীন তাজউদ্দীন আহমদ তার পরিবারের সঙ্গে কখনো রাত্রিযাপন করেননি। থাকতেন প্রধানমন্ত্রীর অফিসের পাশে একটি ছোট্ট ঘরে।

২৭ মার্চ ঢাকা থেকে ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার সময়ও তার পরিবারকে কিছু না বলেই চলে গিয়েছিলেন। পরে কুড়িয়ে পাওয়া কাগজে স্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন, ‘লিলি, আমি চলে গেলাম। যাবার সময় কিছুই বলে আসতে পারিনি। মাফ করে দিও। আবার কবে দেখা হবে জানি না … মুক্তির পর। তুমি ছেলেমেয়ে নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাথে মিশে যেও। দোলনচাঁপা।’ তাজউদ্দীন আহমদের ছদ্মনাম ছিল দোলনচাঁপা।

দুই মাসের জীবন-মরণ সংগ্রামের পর ২৭ মে কলকাতায় পৌঁছেছিল তাজউদ্দীনের পরিবার। তাদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকতেন মওলানা ভাসানী। পার্ক স্ট্রীটের কোহিনূর প্যালেসে তাজউদ্দীন আহমদ ভাসানীর সঙ্গে আলোচনার জন্য যেতেন। ফাঁকে কয়েক মিনিটের জন্য পরিবারের কাছে গেলেও নিজের পারিবারিক কাজে কখনো পরিবারকে দেখতে যাননি।

একবার একমাত্র ছেলে ও সবার ছোট সন্তান সোহেলের প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল। বাসা থেকে জোহরা তাজউদ্দীন বার বার খবর দিলেও ছেলে দেখতে যাচ্ছিলেন না তাজউদ্দীন। অফিসে অনেকবার খবর আসা দেখে একজন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় থাকা ভারতীয় অফিসার জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন নিজের ছেলেকে দেখতে বাসায় যাচ্ছেন না।

তাজউদ্দীন বলেছিলেন, যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তো তার রণাঙ্গণে আহত সৈনিকের খবর নেবে। আমার ছেলে অসুস্থ হয়ে বাসায় আছে, তাকে দেখার অনেক মানুষ আছে। যে মুক্তিযোদ্ধা হানাদার বাহিনীর হামলায় পা হারিয়েছে, অনেকে লুকিয়ে জঙ্গলে ঘুরছে। যারা দেশের জন্য যুদ্ধের ময়দানে লাশ হয়ে পড়ে আছে,তাদের পরিবার সেই মৃত্যুর খবরটি পর্যন্ত পাচ্ছে কিনা সন্দেহ। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর পরিবার তো নিরাপদে কলকাতা শহরে আছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কূটনীতিতে বিশেষ অবদান রাখা ও পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য এ. আর মল্লিক তাজউদ্দীনকে সংসার জীবন থেকে দূরে থাকার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন কলকাতায় থাকতে। যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ভাই, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমার পরিবারের সঙ্গে এক বাসাতে থাকতে চাই না। কাজের সুবিধা হয়, সাংসারিক ঝামেলা আমি নিতে চাই না।’ তার গায়ে একটি শার্টই প্রায় দেখতাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, শার্ট বদলান না কেন? বললেন, ‘ওটাও হাঙ্গামা হবে। এই শার্টটা ময়লা কম হয়, গোসল করা সময় মাঝে মাঝে ধুয়ে নিই’। দ্যাট ওয়াজ তাজউদ্দীন।

লেখক : সদস্য, তাজউদ্দীন আহমদ পাঠচক্র।

print