মোঃ তারিকুল ইসলাম, শিক্ষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও
সদস্য, সেলফ আসেসমেনট কমিটি, আইকিউএসি :
এইচএসসি পরীক্ষা যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা গ্রহনের বিষয়টি। আর এই পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয় সত্যিই আমাদের জন্য অনেক উৎকণ্ঠা ও চিন্তার উদ্রেক করে। আর একটি জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি ছাত্রছাত্রীদের এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে ভাল শিখন-শিক্ষণ ব্যবস্থা না থাকে, শিক্ষা গ্রহণের অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান না থাকে, অভিভাবকমহল সচেতন না থাকে তাহলে তাদের পক্ষে ভাল ফলাফাল সম্ভব হয় না। আর ভাল ফলাফল না করলে তারা কোন ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন, বুয়েট, মেডিকেল, বিশ্ববিদ্যালয় চান্স পাবে না। ফলে স্থানটি মেধা শূন্য হওয়ার সুযোগ থাকে। তাই এই পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষাগ্রহন ও ভাল ফলাফল শিক্ষার্থীর স্বপ্নপূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যতগুলি ভাল বিদ্যাপিঠ রয়েছে তার মধ্যে সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, শহীদ সৃতি ডিগ্রী কলেজ প্রভৃতি অন্যতম। এই সবগুলো কলেজ পিরোজপুর জেলায় অবস্থিত। এই কলেজগুলো থেকে পড়াশুনা করে খ্যাতনামা হয়েছেন দেশের অনেক গুণী ব্যক্তি। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবৎ এই কলেজগুলো উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য পায়নি ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীরা খুব বেশি ভাল প্রতিষ্ঠানে চান্স পায়নি। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তাই বিষয়টি বিজ্ঞ মহলের ভাবনার দাবী রাখে। ২০১৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিভিন্নও সুত্র থেকে যা পাওয়া যায় তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই বছর পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে মোট শিক্ষার্থীর ছিল ৭৪৯ জন তার মধ্যে থেকে ৪৪৬ জন পাশ ও ৩০৩ জন শিক্ষার্থী ফেল করে এবং পাসের হার ৫৯ শতাংশ । অন্যদিকে পিরোজপুর সরকারি মহিলা কলেজ মোট শিক্ষার্থীর ছিল ৬১৪ জন তার মধ্যে থেকে ৫৩৩ জন পাশ ও ৮১ জন শিক্ষার্থী ফেল করে এবং পাসের হার ৮৬.৮১ শতাংশ । আফতাব উদ্দিন কলেজ মোট শিক্ষার্থীর ছিল ৩১৪ জন তার মধ্যে থেকে ১৫১ জন পাশ ও ১৬১ জন শিক্ষার্থী ফেল করে এবং পাসের হার ৪৮ শতাংশ ।
উপরের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়নি। পিরোজপুর জেলার অন্যান্য কলেজগুলোতেও কাঙ্খিত সাফল্য পাওয়া যায়নি। এই বছর ফলাফল বিপর্যয় শধু কোন একটি জেলার ক্ষেত্রে নয় বরং সারা দেশের ফলাফলের চিত্র মোটেই কাঙ্খিত নয়। হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে ফেল করা শিক্ষার্থী অনেক বেশি ফলে সারা দেশে এ বছর পাসের হার গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম- ৬৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০০৯ সালে পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা ২০১২ সালের বেড়ে হয়েছিল ৭৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ এ বছর সারাদেশে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১০,৭২,০২৮ জন শিক্ষার্থী যার মধ্যে ৬,৯১,৯৫৮ জন কৃতকার্য এবং ৩,৮০,০৭০ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এই অকৃতকার্য শিক্ষার্থী সংখ্যা নেহায়েত কম নয় তা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ৩৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। যা আমাদের মোটেই কাঙ্কিত নয়।
আটটি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষা

** এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেন ১০,৭২,০২৮ জন
** পাস করেছেন ৬,৯১,৯৫৮ জন
** অকৃতকার্য হয়েছেন ৩,৮০,০৭০ জন
(সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো- ২০ জুলাই, ২০১৮)

একজন শিক্ষক হিসাবে যখন দেখি ছাত্রছাত্রীরা পড়াশুনা করে ভাল রেজাল্ট করেছে তখন খুব আনন্দিত হই আর যখন অনেক বেশি সংখ্যায় খারাপ রেজাল্ট করে তখন খুবই খারাপ অনুভূতি হয়। তখন ভাবনা তৈরী হয় এই সকল অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অবস্থা কি হবে? আর যখন সেই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশী হয় তখন বিষয়টি কর্তৃপক্ষের আলাদা ভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ এই বিশাল সংখ্যার শিক্ষার্থী অনিয়মিত শিক্ষার্থী হিসাবে পরিগণিত হবে এবং তাদের ব্যাপারে কোন প্রতিষ্ঠানের ভাবনা থাকবে না, যা সত্যিই দুঃখজনক। সাধারণত দেখা যাবে কলেজগুলো গতবারের খারাপ ফলাফলের কারণ বিশ্লেষণ করে নতুন শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে নানা পদক্ষেপ নিবে যেমন- টিউটরিয়াল ক্লাস, বিশেষ কøাস, ক্লাস টেস্ট ইত্যাদি। কিন্তু গত বছরের অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে কারও ভাবনা ও পরিকল্পনা থাকবে না। তারা হয়তো নিজ উদ্যোগে চেষ্টা করে কিছু ভাল ফলাফল করার চেষ্টা করবে আর অধিকাংশই ঝরে পড়া শিক্ষার্থী হিসাবে পরিসংখ্যায় রেকর্ডভুক্ত হয়ে যাবে।
এসকল অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীর অনেকেই রয়েছেন মেয়ে শিক্ষার্থী, তারা একবার পরীক্ষায় ফেল করলে অনেক পরিবার তার পড়াশুনার ব্যাপারে আর উৎসাহ দেখায় না, বরং তাকে দ্রুত বিয়ে দিতে চায়। ফলে তার আবার নতুন করে পড়াশুনা করে পরীক্ষা দেয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। ফলে তার আর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হয় না।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পিরোজপুরসহ সারা দেশে এ সকল অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের অধিক এবং তারা কি আমাদের সমাজ ও পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে থাকবে, নাকি বিশেষ শিক্ষাদান ও প্রেষণার মাধ্যমে তাদেরকে সম্পদে পরিণত করা যাবে। আজ যদি তাদের দিকে বিশেষ নজর দেয়া না হয় তবে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে, মাদকাগ্রস্থ হয়ে পড়তে পারে বা কোন অসাধুচক্রের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা আমাদের জন্য মোটেই কাঙ্খিত নয়। এ ব্যাপারে কিছু পরামর্শ তুলে ধরলামঃ
প্রথমতঃ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন একটা ছঁধষরঃু অংংঁৎধহপব ঈবষষ থাকবে যারা প্রতিবছর যে কোন পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের কাজ করবে।
দ্বিতীয়তঃ প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে নিজ নিজ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়তঃ শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশুনায় উৎসাহ হারিয়ে না ফেলে সেজন্য অভিভাবক, শিক্ষক ও বন্ধুমহলের অনুপ্রেরণা ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
চতুর্থতঃ ফেল করা শিক্ষার্থীর অনেকেই মেয়ে তাই তাদের পড়াশুনা যেন বন্ধ হয়ে না যায় সেজন্য তাদের পরিবারকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রয়োজনে আর্থিক অনুদান প্রদান করা।
পঞ্চমঃ যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই সেখানে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেয়া।
ষষ্ঠঃ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা।
সপ্তমঃ সৃজনশীল পদ্ধতির সঠিক জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকসহ সহায়ক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
অষ্টমঃ কারিগরী ও কর্মমুখী শিক্ষাকে যুগোপযোগি করা। যাতে এই শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশে বিদেশে চাকুরীর সুযোগ পায়।
নবমঃ শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্য স¤পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের জন্য গুনগত শিখন-শিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
দশম ঃ এসব শিক্ষার্থী যদি এই শিক্ষা ব্যবস্থায় উৎসাহ বোধ না করে তাহলে তাদেরকে কারিগরী ও কর্মমুখী শিক্ষায় পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে প্রভৃতি।
পরিশেষে অনেকেই প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়া, প্রশ্ন ফাঁস না হওয়া ও দীর্ঘ সময়ব্যাপী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়াকে খারাপ ফলাফলের কারণ হিসেবে ধরে নেন। মনে রাখতে হবে এসব পরীক্ষারই অংশ। তাই এগুলো কোন মৌলিক কারন বলে বিবেচিত হয় না। তাই এখন সময় এসেছে এসব নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার। সুতরাং পরীক্ষায় ছাত্রছাত্রীরা ভাল ফলাফল করলে আমরা যেমনি সাধুবাদ জানাই তেমনি যারা অকৃতকার্য হয়েছে, তারা কেন খারাপ ফলাফল করল? তা সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সাথে সাথে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যেন সমাজের বোঝা না হয়ে ভাল ফলাফলের মাধ্যমে পরিবার তথা দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে সে ব্যাপারে সঠিক কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে।
মোঃ তারিকুল ইসলাম, শিক্ষক,
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও
সদস্য, সেলফ আসেসমেনট কমিটি, আইকিউএসি।

print