কঁচা নদীতে অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণ ঘিরে পূরণ হতে যাচ্ছে পিরোজপুরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। জেলা শহরের ৫ কিলোমিটার পূর্বে কঁচা নদীর ভাটিতে কুমিড়মারা-বেকুটিয়া ফেরিঘাটের সন্নিকটে এ সেতু নির্মাণের প্রাথমিক কাজ চলছে। স্বপ্নের বেকুটিয়া সেতু নির্মাণে বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের অপরদিকে দেশের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর পায়রা এবং সমুদ্রসৈকত সাগরকন্যা কুয়াকাটার সঙ্গে সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল এবং সমুদ্রবন্দর মংলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করবে কঁচা নদীর এ সেতুটি। ৯৯৮ মিটার দৈর্ঘ্যরে সেতুটি নির্মাণে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬৫৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা চীন সরকার দেবে। বাকি অর্থ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগে উপসহকারী প্রকৌশলী হামিদুর রহমান জানান, নদীর দুই পাশে ভূমি উন্নয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। মূল সেতুর কাজ অক্টোবরে শুরু হবে। সরেজমিন দেখা গেছে, বিভিন্ন ধরনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেশিন ও মালবাহী যানবাহনের আনাগোনায় কর্মমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে এখানে। সেতু নির্মাণকে ঘিরে কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। চলছে ফিল্ড নির্মাণের কাজ। এখানে কাজ করছেন চীনা প্রকৌশলী এবং বাংলাদেশিরা। কুমিড়মারা প্রান্তে বালু ভরাট দিয়ে সেখানে শেড নির্মাণের জন্য দম ফেলার সময় মিলছে না প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের। সেতুটির নির্মাণসামগ্রী রাখা ও শ্রমিকদের থাকার জন্য এ ফিল্ড তৈরি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চীনা অনুদান সহায়তায় বাস্তবায়িতব্য বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের বেকুটিয়া কঁচা নদীর ওপর অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণের জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, স্থাপনা অপসারণের প্রাথমিক কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। চীন সরকারের অনুদানে এ গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি নির্মিত হচ্ছে শুনে বরিশাল এবং খুলনা বিভাগের কোটি মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক অন্যরকম উৎসাহ-উদ্দীপনা। স্বপ্নের সেতু পদ্মার সঙ্গে প্রায় একই সময় শেষ হবে বেকুটিয়া সেতুর নির্মাণকাজ। সূত্র জানায়, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন ও ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত মা মিনকিয়ং সই করেন। চুক্তি সইয়ের পর ইআরডির জ্যেষ্ঠ সচিব মেজবাহউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, এর আগে চীন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ শতভাগ অনুদানে সাতটি সেতু করে দিয়েছে। এবার অষ্টম মৈত্রী সেতু হিসেবে বরিশাল-খুলনা মহাসড়কের কঁচা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করে দেবে। সূত্রে জানা যায়, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর প্রেরিত এক পত্রে দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলেছেন। ২০১৬ সালের ১৬ জুন রাজধানীর সড়ক ভবনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট উইংয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পরিমল বিকাশ সূত্রধর এবং চীন সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা এজেন্সির ডেপুটি ডিরেক্টর জিয়াং জিং অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণের চূড়ান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ২০১৯ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হবে। ৯৯৮ মিটার দৈর্ঘ্যরে সেতুটি নির্মাণে প্রকল্প মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬৫৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা চীন সরকার দেবে। মূল সেতুর দুইদিকের সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণের মূল্য এবং সড়ক নির্মাণের খরচ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। এছাড়া নির্মাণকাজে বিদ্যুৎ, মাটি ভরাট এবং চীনের প্রকৌশলীসহ চীনা কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থার দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের। কুমিড়মারা-বেকুটিয়া ফেরিঘাট থেকে ৮৩৫ মিটার দক্ষিণে এবং কাউখালী প্রান্তের ফেরিঘাট থেকে ১১৫ মিটার উত্তরে ১.৪৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১৩.৪ মিটার প্রশস্ত এবং সেতুর উভয় পাশে ১.৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। সব নদী শাসন, আবহাওয়া, বাতাসের গতি, নদী ভাঙন বিষয়ে জরিপের জন্য চীনা বিশেষজ্ঞ দল কয়েকবার এসে এলাকা ঘুরে সবকিছু চূড়ান্ত করেছে। এদিকে দীর্ঘদিনের সীমাহীন দুর্ভোগ লাঘব হতে যাওয়ায় এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-শোর মানুষের মুখে মুখে এখন পদ্মা ও বেকুটিয়া সেতু। এ সেতু নির্মাণের জন্য বিভিন্ন সময় সংসদে ও সংসদের বাইরে বিভিন্ন সমাবেশে সেতু নির্মাণের দাবি তোলা হচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আন্তরিক হওয়ায় এ সেতুটি নির্মিত হতে যাচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ সরকার এবং চীন সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন জেলাবাসী। দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত বেকুটিয়া সেতুর কাজ সমাপ্ত হলে বেকুটিয়া ও চরখালী ফেরি সার্ভিসের আর কোনো প্রয়োজন হবে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আজমির হোসেন জানান, আমাদের প্রতিষ্ঠান যে কাজ পেয়েছে, তা দ্রুতগতিতে করার চেষ্টা করছি। আমাদের লোকজন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য।

print