পিরোজপুর প্রতিনিধি : আজ ৮ ডিসেম্বর। পিরোজপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পিরোজপুর সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয় পাক সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে অবস্থানকারী সেনারা পালিয়ে যায়। পিরোজপুর হয় শত্রুমুক্ত। ঘরে ঘরে উড়ে বিজয়ের পতাকা।
১৯৭১ সালের ৪ মে পিরোজপুরে প্রথম পাক বাহিনী প্রবেশ করে। শহরের প্রবেশদ্বার হুলারহাট নৌ-বন্দর থেকে পাকবাহিনীরা প্রবেশের পথে প্রথমেই তারা মাছিমপুর ও কৃষ্ণনগর গ্রামে শুরু করে হত্যাযজ্ঞ। স্থানীয় শান্তিকমিটির নেতা ও রাজাকারদের সহায়তায় সংখ্যালঘু ও স্বাধীনতা পক্ষের লোকজনদের বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়া হয়। হত্যা করা হয় বহু লোককে। ৬ মে রাজাকারদের সহায়তায় ধৃত পিরোজপুরের তৎকালিন এসডিও আঃ রাজ্জাক, ডেপুটি মেজিষ্ট্রেট মোঃ মিজানুর রহমান, এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহম্মদকে পাকসেনারা গুলি করে হত্যা করে। এরপর হায়নার দল হত্যা করে দূর্নীতি দমন বিভাগের দারোগা হীরেন্দ্রনাথ মহাজনকে। পিরোজপুরের ছাত্রলীগের সভাপতি ওমর ফারুককে মাথায় লোহার রড ঢুকিয়ে নির্মম ভাবে ৪ জুন হত্যা করা হয়। ৬ জুন মঠবাড়িয়া থেকে দশজন ছাত্র ও যুবককে ধরে এনে ১০ জুন তাদেরকে পিরোজপুর বলেশ্বর নদীর তীরে বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে ছিল এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় যশোর বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন শাস্ত্রের সম্মান শ্রেণীতে অধ্যায়নরত কৃতী ছাত্র গণপতি হালদার, মঠবাড়িয়া কলেজের ভিপি আনোয়ারুল কাদির, জিয়াউদ্দিন, মোস্তফা কামাল, সুধীর, মালেক, অমল, বীরেণ, শামসুল হক সহ প্রমূখ। ১৬ জুন হত্যা করা হয় সেলিম, পূর্নেন্দ, বাচ্চু, প্রবীর, দেবু, পঙ্কজ, আসাদ, দুলাল, অনীল, প্রতুল অহিন্দ্র কর্মকার, মতি সাহা, কৃষ্ণ রায়, নির্মল, বিমল, মহেন্দ্র চক্রবর্তীসহ আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। পাকসেনারা কাউখালী সুভাষ চন্দ্র দত্ত ও পিরোজপুরের উত্তর রাণীপুর গ্রামের কালু মহাজনকে কাউখালী স্টীমার ঘাটে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এছাড়া পাকসেনা ও আল-বদর বাহিনী নাজিরপুরের কলারদোয়ানিয়া গ্রামের জহিরউদ্দিন বাহাদুরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। হায়নার দল পিরোজপুর সদর উপজেলার তেজদাসকাঠী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে খালের পাড়ে একসঙ্গে ২৩ জনকে হত্যা করে। জুজখোলা গ্রামের আইউব আলী মেম্বারের পরিবারের ১৪জনকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়। বিশিষ্ট সমাজ সেবক শতীষ মাঝি ও ডাঃ ওয়াজেদ আলী হাওলাদারকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে পাকসেনারা।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকবাহিনী ও তাদের দোসর আল-বদর ও রাজাকাররা তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমার স্বরূপকাঠীতে চালায় সবচেয়ে বেশী হত্যাযজ্ঞ। উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পিছনের ডোবায় ৪০০ জনকে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। স্বাধীনতার পরে ঐ স্থান থেকে কয়েক শ’ মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়েছিল। ৮ নভেম্বর একই উপজেলার সোহাগদল গ্রামের বরচাকাঠীতে একই বাড়ীর ৭ জনকে এক দড়িতে বেঁধে হত্যা করা হয়। পরে ঐ ৭ ব্যক্তির লাশ একসঙ্গে ইন্দ্রেরহাট নদীর পাড়ে এক কবরে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়। ২৪ মে দৈহারী ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ীর সামনে ১৭ জনকে বেঁধে হত্যা করে হায়নারা। ২৯ মে খারাবাক গ্রামের অঞ্জলী কর্মকারকে পাকসেনারা হাত-পা বেঁধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে। ১৬, ১৭ জুন জলাবাড়ী, মাদ্রা, আতা, গণপতিকাঠীসহ প্রভৃতি গ্রামে কয়েক শ’ লোককে হত্যা করা হয়। তারা একমাত্র জুলুহার গ্রামে ৬৮জনকে হত্যা করে। ১ জুলাই স্বরূপকাঠী থানা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি কাজী শামসুল হককে হুলারহাট লঞ্চ ঘাটে এনে হত্যা করে নির্মমভাবে। পাকিস্তানী সেবাবাহিনী স্বরূপকাঠীর ১৪০ টি গ্রামেই হত্যাকান্ড, নারী নির্যাতন ও ধ্বংসলীলা চালায়। তারা এ অঞ্চলে প্রায় ১৪ হাজার লোককে হত্যা করে। স্বরূপকাঠীতে পাকবাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালায় তা নাৎসীদের ইহুদী হত্যা এবং ভিয়েতনামের মাইলাই হত্যাকে ছাড়িয়ে যায় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
স্বাধীনতা যুদ্ধে পিরোজপুর সদর উপজেলার বাগমারা গ্রামের ভাগিরথী সাহার আত্মদানের কথা আজও পিরোজপুরবাসী ভুলতে পারেনি। পিরোজপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটা বড় অংশ দখল করে রেখেছেন এই বীরঙ্গনা ভাগিরথী সাহা। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করার অপরাধে ১৯৭১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তাকে হত্যা করা হয়েছিল জীবন্ত অবস্থায় মোটর সাইকেলের সাথে দড়ি বেঁধে সারা শহরে টেনে-হিঁচড়ে উলঙ্গ করে ঘোরানোর পর বলেশ্বর বধ্যভূমিতে নিয়ে গুলি করে ক্ষতি বিক্ষত দেহ নদীর উত্তাল তরঙ্গের মাঝে নিক্ষেপ করা হয়।
পিরোজপুরকে হানাদার মুক্ত করতে ৬ ডিসেম্বর সুন্দরবনের শরনখোলা রেঞ্জ হেড কোয়াটারে ৯নং সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিন এক পরিকল্পনা বৈঠক করেন। এ বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন মুক্তিবাহিনীর ইয়াং অফিসার হারুন-অর-রশিদ, শামসুল হক খান, কামাল উদ্দিন, কালাম মহিউদ্দিন, একেএমএ আউয়াল, লিয়াকত আলী শেখ বাদশা প্রমূখ বীর মুক্তিযোদ্ধা। এ বাহিনী ৭ ডিসেম্বর রাত ১০টায় পিরোজপুরের দক্ষিণপ্রান্ত পাড়েরহাট বন্দর দিয়ে শহরে প্রবেশ করে। মুক্তিবাহিনীর এ আগমনের খবর পেয়ে পাক হায়নারা শহরের পূর্বদিকের কচানদী দিয়ে বরিশালের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যায়। এর আগে স্বরূপকাঠী পেয়ারা বাগানে মুক্তিযোদ্ধাদের গড়ে তোলা দূর্গে পাকবাহিনী আক্রমন করলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বহু পাকসেনা নিহত হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমন পাকবাহিনী পর্যুদস্ত হতে থাকে। অবশেষে ৮ ডিসেম্বর পিরোজপুর ছেড়ে তারা চলে যেতে বাধ্য হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা পিরোজপুর অঞ্চলে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষকে হত্যা করে। সম্ভ্রম লুটে নেয় প্রায় ৫ হাজার মা-বোনের।
স্বাধীনতা যুদ্ধে তৎকালীন আওয়ামীলীগের এমএলএ এডভোকেট এনায়েত হোসেন খান, এমপি ডাঃ আঃ হাই, ন্যাপের (মো) এডভোকেট আলী হায়দার খান, এডভোকেট সিরাজুল হক, সিপিবির এডভোকেট এমএ মান্নান ও ভাসানী ন্যাপের শহীদুল আলম নীরু এ অঞ্চলে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তাদের নেতৃত্বে স্থানীয়ভাবে গঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় বিপ¬বী সরকার।
পিরোজপুর মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে আজ মুক্ত দিবস উদযাপন পরিষদ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে সকাল ৯টায় শহরের গোপাল কৃষ্ণ স্বাধীনতা মঞ্চে স্বাধীনতার গান। সকাল ১০টায় আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়ে শহীদ স্মৃতিস্তম্বে পুষ্পমাল্য অর্পণ।

print