স্টাফ রিপোর্টার : বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ১৯৩২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, রোজ রোববার পিরোজপুর জেলা সদরের ডুমরিতলা গ্রামের এক সমভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। বরিশাল ব্রজ মোহন কলেজ থেকে আই.এস.সি পাস করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ১৯৫০ সালে তিনি পাকিস্তান নৌ বাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হিসাবে যোগদান করেন। নৈপণ্য ও দক্ষতার প্রমান প্রদর্শন করায় ১৯৫১ সালে ইংল্যান্ডে নেভাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রীও প্রশিক্ষন গ্রহনের জন্য তাকে মনোনীত করা হয়। তিনি রয়্যাল নেভাল ইঞ্জিরিয়ারিং কলেজের সকল পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে মেরীন বিশেষজ্ঞ কোর্সে ম্যালভিন রয়্যাল কলেজে অধ্যায়ন করেন এবং প্রথম স্থান অধিকার করেন।
বৃটেনে অবস্থান কালে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিশেষ মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ নির্ধারিত কোর্সে পাশ করা ছাড়াও চাকুরী জীবনে তিনি নিম্ন লিখিত ডিগ্রী ও ডিপ্লোমা লাভ করেনঃ বৃটিশ ইনস্টিটিউট অব মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রাজুয়েট, বৃটিশ ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং এসোসিয়েট, বৃটিশ যোগাযোগ দপ্তরের প্রথম শ্রেণীর ইঞ্জিনিয়ারিং সার্টিফিকেট, বৃটিশ নিউক্লয়িাস ইঞ্জিনিয়ারিং স্সোাইটির মেম্বর ও বৃটিশ ইনস্টিটিউট অব চাটার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং মেম্বর।
পাকিস্তান নৌ-বাহিনীতে বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালী সদস্যদের মধ্যে সুযোগ সুবিধার অযৌক্তিক বৈষম্য লক্ষ্য করে তিনি ক্ষুদ্ধ হন এবং বাঙ্গালী অফিসার ও সৈনিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক অভিমত প্রকাশ করেন। কিন্তু আকাঙ্খিত ন্যায্য অধিকার আদায়ে ব্যার্থ হয়ে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্ধুব্ধ হয়ে ১৯৫২ সালে ইংল্যান্ডে বসে ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাঙ্গালী জনগণের জন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে ইংল্যান্ডে অবস্থান কালে স্বাধীনতার সংগ্রামের একটি পরিকল্পনা করেন এবং রাজনৈতিক ও সামরিক রনকৌশলের নীল-নকশা তৈরি করেন। ১৯৬০ সালে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের পর উক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের জন্য সামরিক ছাউনির ভয়ংকর বেড়াজালের ভেতর থেকেই “বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনী” নামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলেন।
১৯৬৭ সালে গুপ্ত সংগঠনের এক সদস্যের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কর্মকান্ড সম্পর্কে পাকিস্তান সরকার অবহিত হন এবং বাঙ্গালী জনগণের স্বাধীনতার এই প্রচেষ্টাকে “আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলা” নামে অভিহিত করে, ১৯৬৭ সালের ৯ই ডিসেম্বর পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে তাকে ১ম অভিযুক্ত হিসাবে গ্রেফতার করেণ এবং পরবর্তীতে ক্রমবিকাশমান ৬ দফা স্বাধীকার আন্দোলনকে স্তব্ধ করার হীনউদ্দেশ্য পাক-সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-কে ১নং ও লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে ২নং অভিযুক্ত করে মামলার কার্যক্রম শুরু করেন। কিন্তু বাঙ্গালী জনগণের আন্দোলনের চাপে পাক- সরকার ১৯৬৯ সালে ২২শে ফেব্রুয়ারী সব অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালে তার নেতৃত্ব গঠিত হয় “লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি”।
বাংলাদেশ সৃষ্টির অন্যতম পথিকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলার সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম চিন্তাবিদ, কুখ্যাত আগারতলা য়ড়যন্ত্র মামলার বিখ্যাত নায়ক। পাকিস্তানের প্রথম রাজদ্রোহী। একদফা আন্দোলনের অগ্রদূত। লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা। বালাতন্ত্রের প্রবক্তা ও পাক-সরকারের বাঙ্গালী হত্যা তালিকায় এক নম্বর ব্যক্তি। এই অকুতভয় বিচক্ষণ বাঙ্গালী বীর সেনানীকে ১৯৭১ সালেল ২৬শে মার্চ, ভোর বেলা বর্বর হানাদার বাহিনীর পশুরা তাঁর ৩৬নং এ্যালিফেন্ট রোডের, বাস ভবনের সামনে গুলি করে নির্মম ভাবে হত্যা করে।
বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর চিফ-অব-নেভাল স্টাফ, ভাইস এডমিরাল, জহির উদ্দিন আহম্মেদ- এর নেতৃত্বে নৌ বাহিনীর উর্ব্ধতন কর্মকর্তাদের একটি টিমের কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার কর্মফলে, দীর্ঘ ৪০ বছর পর বাংলাদেশ সরকার ও রাষ্ট্র দায়বদ্ধতা থেকে গত ২৫শে মার্চ ২০১২ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান ও চরম আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ আগারতলা মামলার ২য় অভিযুক্ত শহীদ লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে স্বাধীনতা পুরস্কার (মরনোত্তর) ২০১২ প্রদান করেন এবং সরকারীভাবে একখানা সম্মানপত্র, আঠারো ক্যারেট মানের স্বর্ণ দিয়ে তৈরি পঞ্চাশ গ্রাম ওজনের একটি পদক ও দুইলক্ষ টাকার চেক প্রদান করেন।

print